সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীর হাতেই ঘুরছে এলএ শাখার চাবিকাঠি, পুরনো ট্রাডিশন ধরে রেখে ঢাকা ডিসি অফিসে মজিবুল হকের দুর্নীতির মহোৎসব
- আপডেট: ০৯:৪৭:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৮০৭৭
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় যেন যুগ যুগ ধরে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, নথি গায়েব ও জালিয়াতির এক অপরাজেয় দুর্গে পরিণত হয়েছে। যেখানে সাধারণ নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে পদে পদে হয়রানি ও চরম শোষণের শিকার হচ্ছেন আর এই দুর্নীতির আবহমান ঐতিহ্যকে ধারণ করে বর্তমানে পুরো ডিসি অফিস বিশেষ করে এর ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখাকে নিজের একক নিয়ন্ত্রণ ও অপকর্মের সাম্রাজ্যে পরিণত করেছেন চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড খ্যাত বিতর্কিত কর্মকর্তা মজিবুল হক। মূলত রাজধানীর জমি সংক্রান্ত যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের তিক্ত অভিজ্ঞতা বলছে এই কার্যালয়টি রাষ্ট্রীয় সেবা কেন্দ্র না হয়ে উঠেছে এক সুসংগঠিত দালালি, প্রতারণা ও অনিয়মের মহাআখড়া। সাভার, কেরানীগঞ্জ, ধামরাই কিংবা রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা জমির মূল মালিকেরা দিনের পর দিন নামজারি, রেকর্ড সংশোধন, উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পরিবর্তন বা জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের চেক তুলতে এসে সরকারি কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যৌথ সিন্ডিকেটের কাছে সম্পূর্ণ জিম্মি হয়ে পড়ছেন। উদাহরণস্বরূপ সাভারের সাধারণ এক স্কুল শিক্ষক দীর্ঘ দুই বছর ধরে নিজের অত্যন্ত নায্য নামজারির আবেদনের পেছনে দিনরাত ছুটেও কোনো সুরাহা পাননি। বারবার ডিসি অফিসে ধরণা দিয়ে ও আবেদন করেও কাজ না হওয়ায় অবশেষে দালালদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় ঘুষের মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে এই ফাইল চিরকালের জন্য লালফিতায় বন্দি হয়ে পড়ে থাকবে এবং সরকারি দফতরে নিজের বৈধ ফাইলের খোঁজ নিতে গিয়ে তাকে উল্টো অপরাধীর মতো অপরাধবোধ ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়। অনুসন্ধান ও গভীর তদন্তে জানা গেছে যে, ডিসি অফিসে জমির নামজারি থেকে শুরু করে নথি যাচাইয়ের প্রতিটি ধাপে গড়পড়তা ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত আবেদন ঝুলিয়ে রাখা একটি নিয়মিত অপকৌশলে পরিণত হয়েছে, এবং সেবাগ্রহীতাকে ঘুষ দিতে বাধ্য করতে বা মোটা অঙ্কের টাকা না পেলে কৌশলগতভাবে ‘ফাইল হারিয়ে গেছে’ বলে নতুন করে আবেদন জমা দেওয়ার নতুন নাটক সাজানো হয়, যা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অফিস সহকারী ও বহু ভুক্তভোগীর সরাসরি বক্তব্যেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত ডিসি অফিসের সুবিশাল প্রধান গেট, ভেতরের করিডোর ও সিঁড়িগুলোতে চোখে পড়ে একদল সুযোগসন্ধানী ও সুসংগঠিত দালালের আনাগোনা, যারা সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে কাজ দ্রুত করিয়ে দেওয়া বা উচ্চপর্যায়ে বিশেষ যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে লাখ লাখ টাকার চুক্তি করে। কারণ তারা নিজেরাও আড়ালে স্বীকার করে যে নিয়মের পথে হাঁটলে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর পার হলেও ফাইল এক ইঞ্চিও সরবে না। এই দীর্ঘদিন ধরে গেড়ে বসা দুর্নীতির শিকড় এতই গভীরে প্রথিত যে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা সাধারণ শাস্তি এদের অপরাধের গতি থামাতে পারছে না, বরং এর আগেও যেসব দালাল বা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারী দণ্ডিত হয়েছেন তারা অদৃশ্য সুতার টানে ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে পুনরায় একই আসনে ফিরে এসে আরও ভয়ংকর রূপে ধরা দিচ্ছেন। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় কুশীলব ও খলনায়ক হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন সাবেক কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ও এল এ কেস নং-২০/২০১৫-১৬ এর ভূমি অধিগ্রহণ দুর্নীতির মূল কারিগর মজিবুল হক।
অপরাধ অনুসন্ধানে ও সরকারি নথির তথ্যে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট এল এ কেস নং-২০/২০১৫-১৬তে একাধিক মৌজা ছিল। সেই মৌজার মধ্যে সর্বচ্চো মৌজার মুল্য যেটি সেই হারে ভুমি ক্ষতিপূরন বিল প্রদান করে। তাছাড়া বাড্ডা রেজিস্ট্রি অফিসের একটি ভুয়া দলিল উদ্দেশ্যপ্রোনদিত ভাবে এই ক্ষতিপুরন বিলের সাথে এক ব্যক্তিকে মালিক সাজিয়ে ক্ষতিপূরন বিলের টাকা উত্তোলন করে যা ভুমি অধিগ্রহনের সাথে এই দলির মালিকের কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি এবং সেটি ছিল সম্পূর্ন ভুয়া দলিল। আর এই কাজের মাস্টার মাইন্ড ছিলো সার্ভেয়ার কবির হোসেন, মজিবুল হক,আনিসুর রহমান গংরা।
মজিবুল হক ও তার অনুসারী আনিসসহ এক শক্তিশালী অসাধু সিন্ডিকেট পূর্বে জমি অধিগ্রহণকালে সরকারি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছিল। তারা অত্যন্ত সুচতুরভাবে জমির প্রকৃত শ্রেণী পরিবর্তন করে, ভুয়া ও জাল দলিল সৃজন করে এবং জমিতে অবস্তুগত ভুয়া অবকাঠামোর মূল্য নির্ধারণ দেখিয়ে সরকারের বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়। যার ফলশ্রুতিতে তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয় ও আইনগত প্রক্রিয়ায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয় এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তবে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর, নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর বিষয় হলো, জেল খাটা সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও কারাগার থেকে বের হয়ে মজিবুল হক অত্যন্ত চতুরতার সাথে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক মহলকে ম্যানেজ করে আপিল ও নানা আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পুনরায় একই ডিসি অফিসে নিজের চাকরি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন এবং পুনরায় প্রভাবশালী এলএ শাখাতেই পদায়ন নিশ্চিত করেন। ঢাকা ডিসি অফিসের এলএ শাখা ১, ২, ৩, ৪ ও ৫ প্রতিটি শাখাই ঘুষ ও অনিয়মের মহা আখড়া হিসেবে পরিচিত হলেও এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ লেনদেন, জালিয়াতি ও অপকর্মের রাজত্ব চলে ৩ নম্বর এলএ শাখায়। আর মজিবুল হকের দাপ্তরিক পোস্টিং খাতাপত্রে এলএ শাখা-১ এ থাকা সত্ত্বেও নিজের বিশাল প্রশাসনিক প্রভাব, সিন্ডিকেটের জোর ও ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে তিনি এলএ শাখা-৩ এর যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম, ফাইল অনুমোদন ও কোটি কোটি টাকার বিল ছাড়করণের একক নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও উন্মোচিত হয়েছে যে, মজিবুল হক গং বর্তমানে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে এক অভিনব ও সুচতুর চক্রান্তের রাজত্ব বজায় রেখে চলেছে। যেখানে বিভিন্ন মৌজার অধিগ্রহণকৃত জমির শ্রেণী পরিবর্তন ও ভুয়া অবকাঠামো দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ ভাগবাটোয়ারা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে মৌজা: ব্রাহ্মণ চিরন, রাজারবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও দক্ষিণ উলুন এলাকার এলএ কেস নং ১৭/২৩-২৪, মৌজা: কালাপুর ও দ্বিমুখা এলাকার এলএ কেস নং ১৫/২৩-২৪ এবং মৌজা: বাড্ডা এলাকার এলএ কেস নং ০৭/২৩-২৪ এর কোটি কোটি টাকার অধিগ্রহণ বিল প্রদানের কাজ দ্রুতগতিতে চলমান রয়েছে এবং এই ফাইলগুলোতে মজিবুল হক ও তার চক্র সরাসরি ১ শতাংশ থেকে শুরু করে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নগদ কমিশনের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের বিল বা চেক প্রদান করছে। যদি কোনো সাধারণ জমিদাতা বা ক্ষতিগ্রস্ত সেবাগ্রহীতা মজিবুল হকের চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারিত এই মোটা অঙ্কের পার্সেন্টেজ বা দাবিকৃত ঘুষের টাকা দিতে অস্বীকার করেন, তবে তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয় চরম হয়রানি। মজিবুল হক তার নিজস্ব পোষ্য ও কথিত কিছু ভুয়া ব্যক্তি বা দালালকে সামনে দাঁড় করিয়ে ওই নির্দিষ্ট জমির ওপর মিথ্যা ও বানোয়াট মিস কেস বা আপত্তি দায়ের করিয়ে দেন, যার ফলে সেই বৈধ ফাইলের কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে যায় এবং সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ নিজেদের শতবছরের জমির ক্ষতিপূরণ না পেয়ে চরম হতাশা ও আর্থিক সংকটে পড়ে শেষ পর্যন্ত মজিবুল হকের সিন্ডিকেটের কাছে নতিস্বীকার করে ঘুষ দিতে বাধ্য হন। ঢাকা জেলা প্রশাসনের প্রাক্তন এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে স্বীকার করেছেন যে, এই অফিসে দুর্নীতির শিকড় একদম নিচ তলার পিয়াদা থেকে শুরু করে ওপরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এক বড় অংশের মধ্যবর্তী অনৈতিক সমঝোতায় বিস্তৃত। যেখানে দালালদের সংগৃহীত ঘুষের টাকা নির্দিষ্ট হার ও কমিশন অনুযায়ী ওপরের স্তর পর্যন্ত ভাগবাটোয়ারা হয়ে যায় এবং এর ফলে কোনো সৎ কর্মকর্তা প্রতিরোধ গড়তে গেলে বা নিয়ম মাফিক কাজ করতে চাইলে তাকে নানামুখী প্রশাসনিক চাপ ও কোণঠাসা অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। যে অফিসে প্রতিদিন শত শত সাধারণ নাগরিক বিচার ও সেবার আশায় এসে দালাল ও ঘুষখোর কর্মচারীদের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত ও প্রতারিত হন, সেখানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগা প্রকল্পের দুর্নীতিতে সরাসরি সশ্রম জেল খাটা এবং চাকরিচ্যুত একজন চিহ্নিত ও দাগি অপরাধী কর্মকর্তা মজিবুল হক কিভাবে সকল নিয়ম-নীতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পুনরায় একই এলএ শাখায় ফিরে এসে পুরো কার্যালয়ের দুর্নীতির রাজত্ব ও লাগাম নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন এই প্রশ্নই এখন রাজধানীজুড়ে সেবাপ্রার্থী সাধারণ নাগরিক, জমির মূল মালিক ও সচেতন সুশীল সমাজের মুখে মুখে তীব্র ক্ষোভের সাথে ঘুরপাক খাচ্ছে।




















