০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও বাংলাদেশের নতুন ভূরাজনৈতিক দিগন্ত

  • আপডেট: ০৫:২৬:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৮০৭১

মোহাম্মদ আব্দুল হালিম

পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনীতি এক নতুন ও গতিশীল অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর কূটনৈতিক দূরদর্শিতা,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে দেশের জন্য অনন্য সব সাফল্য অর্জন করেছেন। কেবল ঐতিহ্যগত সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল স্রোতে বাংলাদেশকে যুক্ত করা এবং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়াই তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।

প্রদেয় তথ্যাবলির আলোকে তাঁর এই কূটনৈতিক সাফল্য, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্ব
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতির মূল চাবিকাঠি হলো “National interest first” বা সবার আগে জাতীয় স্বার্থ। দায়িত্ব নেওয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রয়োজনই হবে সর্বাগ্রে বিবেচ্য।

বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬: ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি সংলাপ, অংশীদারত্ব এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন।

বাণিজ্য ও কৌশলগত অবস্থান: বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থানকে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সামুদ্রিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করার আহ্বান তাঁর কূটনীতিকে বাস্তবমুখী ও কার্যকর ভিত্তি দিয়েছে।

২. জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ও ঐতিহাসিক অর্জন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের উপস্থিতি এবং অর্জন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই অধিবেশন কেবল প্রথাগত অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক সামর্থ্যের এক বড় প্রমাণ।

সভাপতিত্বের গৌরব: চলতি বছরের ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে এই পদ অর্জন বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্য।

মার্কিন নেতৃত্বের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগাযোগ: জাতিসংঘ অধিবেশন উপলক্ষে নিউইয়র্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডি মেলেনিয়া ট্রাম্প কর্তৃক আয়োজিত সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ড. জুবাইদা রহমানের অংশগ্রহণ দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই শীর্ষপর্যায়ের যোগাযোগ ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সংলাপের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক দাবি: জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীকে কেবল প্রচলিত অনুরোধের বাইরে গিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তব কর্মপরিকল্পনা, রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি এবং মানবিক সহায়তার অর্থায়নের মতো সুনির্দিষ্ট ও কঠোর প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।

৩. যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য আলোচনা: ১৬ সেপ্টেম্বর ইইউ-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর পথ সুগম হয়েছে। পরবর্তীতে ৪ অক্টোবর ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা অনুসন্ধানের কথা জানান।

অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও মূল্যায়ন: ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের মতে, বাংলাদেশ অচিরেই বিশ্বের শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির একটি হতে পারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৫৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা: ব্রিটিশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা সারাহ কুকের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হিসেবে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে এবং বর্তমান সুবিধা তিন বছর রূপান্তরকালে অব্যাহত থাকবে। এটি দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য একটি বড় স্বস্তির বার্তা।

৪. মালয়েশিয়া ও চীন সফর এবং আঞ্চলিক কূটনীতি
ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও চীন। এই সফরগুলো এশীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বকে দৃঢ় করেছে।

চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক: চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

অর্থনৈতিক করিডর ও তিস্তা প্রকল্প: চীন থেকে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব এবং তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় চীনা অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি এই সফরের অন্যতম বড় কূটনৈতিক অর্জন।

শ্রমবাজার ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির আলোচনা দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

৫. অভ্যন্তরীণ সংস্কার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ বাইরের কূটনীতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং পূর্বে মার্জ করা পাঁচটি ব্যাংককে পুনরায় কার্যকর করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন: সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার সরকারের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

শিল্প পুনরুজ্জীবন তহবিল: আইনশৃঙ্খলা ও বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা: নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সময়োপযোগী কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত দৃশ্যমান ও আত্মবিশ্বাসী একটি রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য কিংবা এশিয়ার পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও লাভজনক কূটনীতির মাধ্যমে তিনি দেশকে এক স্থায়ী উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। এই বহুমুখী সাফল্য ও দূরদর্শিতার মূলমন্ত্র একটাই—”সবার আগে বাংলাদেশ”।

লেখক: মোহাম্মদ আব্দুল হালিম, পুলিশ সদস্য, প্রশিক্ষণ প্রধান, টিডিএস, ঢাকা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও বাংলাদেশের নতুন ভূরাজনৈতিক দিগন্ত

আপডেট: ০৫:২৬:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

মোহাম্মদ আব্দুল হালিম

পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনীতি এক নতুন ও গতিশীল অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর কূটনৈতিক দূরদর্শিতা,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে দেশের জন্য অনন্য সব সাফল্য অর্জন করেছেন। কেবল ঐতিহ্যগত সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল স্রোতে বাংলাদেশকে যুক্ত করা এবং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়াই তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।

প্রদেয় তথ্যাবলির আলোকে তাঁর এই কূটনৈতিক সাফল্য, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্ব
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতির মূল চাবিকাঠি হলো “National interest first” বা সবার আগে জাতীয় স্বার্থ। দায়িত্ব নেওয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রয়োজনই হবে সর্বাগ্রে বিবেচ্য।

বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬: ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি সংলাপ, অংশীদারত্ব এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন।

বাণিজ্য ও কৌশলগত অবস্থান: বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থানকে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সামুদ্রিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করার আহ্বান তাঁর কূটনীতিকে বাস্তবমুখী ও কার্যকর ভিত্তি দিয়েছে।

২. জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ও ঐতিহাসিক অর্জন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের উপস্থিতি এবং অর্জন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই অধিবেশন কেবল প্রথাগত অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক সামর্থ্যের এক বড় প্রমাণ।

সভাপতিত্বের গৌরব: চলতি বছরের ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে এই পদ অর্জন বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্য।

মার্কিন নেতৃত্বের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগাযোগ: জাতিসংঘ অধিবেশন উপলক্ষে নিউইয়র্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডি মেলেনিয়া ট্রাম্প কর্তৃক আয়োজিত সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ড. জুবাইদা রহমানের অংশগ্রহণ দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই শীর্ষপর্যায়ের যোগাযোগ ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সংলাপের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক দাবি: জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীকে কেবল প্রচলিত অনুরোধের বাইরে গিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তব কর্মপরিকল্পনা, রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি এবং মানবিক সহায়তার অর্থায়নের মতো সুনির্দিষ্ট ও কঠোর প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।

৩. যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য আলোচনা: ১৬ সেপ্টেম্বর ইইউ-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর পথ সুগম হয়েছে। পরবর্তীতে ৪ অক্টোবর ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা অনুসন্ধানের কথা জানান।

অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও মূল্যায়ন: ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের মতে, বাংলাদেশ অচিরেই বিশ্বের শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির একটি হতে পারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৫৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা: ব্রিটিশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা সারাহ কুকের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হিসেবে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে এবং বর্তমান সুবিধা তিন বছর রূপান্তরকালে অব্যাহত থাকবে। এটি দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য একটি বড় স্বস্তির বার্তা।

৪. মালয়েশিয়া ও চীন সফর এবং আঞ্চলিক কূটনীতি
ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও চীন। এই সফরগুলো এশীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বকে দৃঢ় করেছে।

চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক: চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

অর্থনৈতিক করিডর ও তিস্তা প্রকল্প: চীন থেকে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব এবং তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় চীনা অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি এই সফরের অন্যতম বড় কূটনৈতিক অর্জন।

শ্রমবাজার ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির আলোচনা দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

৫. অভ্যন্তরীণ সংস্কার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ বাইরের কূটনীতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং পূর্বে মার্জ করা পাঁচটি ব্যাংককে পুনরায় কার্যকর করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন: সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার সরকারের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

শিল্প পুনরুজ্জীবন তহবিল: আইনশৃঙ্খলা ও বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা: নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সময়োপযোগী কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত দৃশ্যমান ও আত্মবিশ্বাসী একটি রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য কিংবা এশিয়ার পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও লাভজনক কূটনীতির মাধ্যমে তিনি দেশকে এক স্থায়ী উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। এই বহুমুখী সাফল্য ও দূরদর্শিতার মূলমন্ত্র একটাই—”সবার আগে বাংলাদেশ”।

লেখক: মোহাম্মদ আব্দুল হালিম, পুলিশ সদস্য, প্রশিক্ষণ প্রধান, টিডিএস, ঢাকা।