১১:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

১৫০ পুলিশের কাঁধে ৭ লাখ মানুষের নিরাপত্তা,অপরাধ দমনে তৎপর পল্লবী থানা

  • আপডেট: ১১:৩৯:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৮০০১

মো.দীন ইসলাম, ঢাকা

রাজধানীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত পল্লবী। প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ মানুষের নিরাপত্তায় বিশাল দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৫০ জন পুলিশ সদস্য। ফলে একজন কর্মকর্তাকে গড়ে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে,যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

প্রতিদিন গড়ে ডজনখানেক সাধারণ ডায়েরি (জিডি),নিয়মিত মামলা দায়ের,আসামি গ্রেফতার এবং আদালত সংক্রান্ত কাজ পরিচালনা পল্লবী থানার নিত্যদিনের কাজ। ৫ আগস্ট পরবর্তী নানা অস্থিরতা এবং যানবাহন ও লজিস্টিক সংকট সত্ত্বে সেবার মানসিকতা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে পল্লবী থানা পুলিশ। মাদক নির্মূল,কিশোর গ্যাংয়ের বিলুপ্তি এবং ক্লু-লেস মামলার দ্রুত রহস্য উন্মোচনে থানাটির সাফল্য সর্বত্র প্রশংসিত।

পল্লবী থানা এলাকার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো আটকে পড়া পাকিস্তানি (বিহারী) ক্যাম্পগুলো। ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক বিক্রি ও গ্যাং কালচার নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে নিয়মিত বিশেষ অভিযান চালাতে হয়। কালশী রোড,সাড়ে ১১ নম্বর মোড় এবং বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ও ছিনতাইকারীদের তৎপরতা রোধে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখতে হয়। এছাড়া, মিরপুর ১১ ও ১২ নম্বর এলাকার ব্যস্ত সড়কগুলোতে বাজার ও অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে তৈরি হওয়া যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগের পাশাপাশি থানা পুলিশকেও ভূমিকা রাখতে হয়। পল্লবী থানার এই অদম্য প্রচেষ্টা সাময়িকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও,দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত জনবল ও আধুনিক যানবাহন বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

পল্লবী থানা সূত্রে জানা যায়,অপরাধ দমনে প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া হয় মাদক নির্মূলকে। গত কয়েক মাসে ক্রমান্বয়ে চালানো বিশেষ অভিযানে বিপুল সংখ্যক মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী গ্রেফতার করা হয়েছে। গুটিয়ে দেওয়া হয়েছে আস্তানা। এমনকি টানা অভিযানে ভেঙে গেছে পল্লবীর শীর্ষ মাদক সিন্ডিকেটগুলোর কোমর। গত তিন মাসে (মে থেকে জুলাই) ১ হাজার ৭৯৫ মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী গ্রেফতার করা হয় এবং প্রায় ৫০টি মাদক মামলা করা হয়। সেই সঙ্গে ৬ হাজার ৪০৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট,২২ কেজি ৮৪৫ গ্রাম গাঁজা, ৪০৪ গ্রাম হিরোইন জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া,কিশোরীর প্রেমের টানে ঘর ছাড়া কিশোরীসহ ১৪৮ জন নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছে পল্লবী থানা।

এদিকে,দেশের সার্বিক পরিস্থিতির মতো ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পল্লবী থানাতেও কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তবে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে পুলিশ সদস্যরা সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠে পুরোদমে স্বাভাবিক পুলিশিং শুরু করেছেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ যুবলীগ-ছাত্রলীগের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধেও দৃঢ় তৎপর থানার পুলিশ সদস্যরা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পল্লবী থানার গেটের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও এরপর পুলিশের তৎপরতায় অপ্রীতিকর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ঝটিকা মিছিল বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চালালে কঠোর হাতে তা দমন করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত মে থেকে জুলাই- এই তিন মাসে সরকার বিরোধী ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জরিত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের প্রায় ৩৩ জনকে গ্রেফতার করে পল্লবী থানা পুলিশ। এসময় তাদের থেকে উদ্ধার করা হয় ৬টি পেট্রোল বোমা এবং একটি চায়না অস্ত্র। পল্লবী এলাকায় অপরাধ দমনে তালিকাভুক্ত প্রায় ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ডাকাত ও ছিনতাইকারী চক্রের ১৭ সদস্য,নিয়মিত মামলায় ২৫১ জন এবং ওয়ারেন্টমূলে ৯২৬ জন আসামি গ্রেফতার করা হয়।

তবে পল্লবী এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ছিল কিশোর গ্যাং। বিশেষ করে ‘ভইরা দে’ এবং ‘বাহুবলী গ্যাং’ এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও দেশীয় অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দিত। পল্লবী থানা পুলিশ বিশেষ পরিকল্পনা করে এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালায়। ‘ভইরা দে’ গ্যাং প্রধান আশিকুর রহমান শান্ত ওরফে আশিককে দেশীয় অস্ত্রসহ তার পুরো চক্রকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

‘বাহুবলী গ্যাং’ দলনেতা বাহুবলীকে গ্রেফতার করে আদালতে চালান করা হয়। পল্লবী থেকে বিলুপ্তির পথে কিশোর গ্যাং। এবিষয়ে পল্লবী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাসান বাসির বলেন, পল্লবী এলাকাকে হয়তো শতভাগ মাদক মুক্ত করা কঠিন, তবে কঠোর আইনি পদক্ষেপে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব। আমরা কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিরুদ্ধে কোনো আপস করব না।

অন্যদিকে,পল্লবী থানা পুলিশের সবচেয়ে বেশি দক্ষতা ফুটে ওঠে চাঞ্চল্যকর ‘রামিসা হত্যা’ মামলায়। ঘটনা ঘটার মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে বিজ্ঞ আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়, যা ডিএমপির মধ্যে পুলিশি দক্ষতার এক অনন্য নজির। এমনকি, কাজের এই স্বীকৃতিস্বরূপ কর্মকর্তা চলতি বছরের গত জুন মাসে ডিএমপির শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জ হিসেবে নির্বাচিত হন পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির।

পল্লবী এলাকায় বসবাস করেন প্রায় ৭-৮ লাখ মানুষ,অথচ তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত মাত্র ১৫০ জন পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি পুলিশের যানবাহনের জরাজীর্ণ অবস্থা ও লজিস্টিক সংকট তো রয়েছেই। তবে এই বিপুল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কালশী মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিয়মিত চেকপোস্ট, টহল ও কড়া নজরদারির মাধ্যমে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছে পল্লবী থানা পুলিশ। লজিস্টিক সাপোর্ট ও জনবল আরও বাড়লে সেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।

পল্লবী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাসান বাসির বলেন, আমি গত মে মাসে এখানে যোগদান করি। যোগদান করার পর থেকেই মাদক নির্মূলটাই আমার প্রথম অগ্রাধিকার। সেক্ষেত্রে গত তিন মাসে আমি ১ হাজার ৭৯৫ মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় আনি। সেইসঙ্গে বিপুল মাদকদ্রব্য জব্দ করি।

এছাড়া, মে মাসে আমাদের জন্য রামিসা হত্যা একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার এবং দ্রুত সময়ে মামলাটির তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করি। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জুন মাসে আমি ডিএমপির মধ্যে শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জ নির্বাচিত হই। পল্লবী এলাকায় অপরাধ দমনে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

তিনি বলেন, হয়তো পল্লবীকে মাদক মুক্ত করতে পারব না, তবে মাদকটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব,ইনশাল্লাহ। এখানে কিশোর গ্যাংয়ের একটা তৎপরতা আছে,এটা নিয়েও কাজ করছি। বেশ কিছু কিশোর গ্যাং ধরেছি।

সম্প্রতি ‘ভইরা দে’ নামের পুরো গ্যাংটিকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেফতার করিছে। তারা এক প্রকার নির্মূল হওয়ার পথে। এছাড়া ‘বাহুবলী গ্যাং’ নামের গ্রুপটাও এখন প্রায় নির্মূলের পথে। পল্লবীতে কিশোর গ্যাং,মাদক নির্মূল করার পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি।

৫ আগস্টের ঘটনায় দেখা গেছে যে পুলিশের অনেকেরই মনোবল ভেঙে গিয়েছিল, পল্লবী থানাও এর ব্যতিক্রম না; এখন এই থানার পুলিশ সদস্যদের কর্মতৎপরতা কেমন রয়েছে এবং কোনো অস্ত্র হারিয়ে লুট হয়ে গেলে সেগুলো ফেরত পাওয়া গেছে কি না? জানতে চাইলে হাসান বাসির বলেন, গোটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই একটি প্রভাব পড়েছিল ৫ আগস্টের পরে। তবে সেখান থেকে আমরা উত্তরণের চেষ্টা করেছি এবং বলা যায় এখন আমরা রিকভারি করে ফেলেছি। আমরা নিয়মিতভাবেই স্বাভাবিকভাবে পুলিশিং করছি। আমাদের কিছু অস্ত্র খোয়া গিয়েছিল,গোটা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্টেশন থেকেই খোয়া গিয়েছিল,সেগুলো উদ্ধারে আমরা চেষ্টা করছি। আমরা গত জুন মাসে আমার থানা এলাকা থেকে একটা উদ্ধার করে আমাদের পুলিশ লাইনে জমা দিয়েছি।

পল্লবীতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং অপতৎপরতার বিষয়ে তিনি বলেন,তাদের বিরুদ্ধে আমরা যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে আছি। গত জুলাই মাসেই ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছি একটা ঘটনা থেকে। এছাড়াও অন্যান্য সময়েও মিছিল করার সময় তাদের গ্রেফতার করে অপতৎপরতা রুখে দেওয়া হচ্ছে। তারা চেষ্টা করছে করার, আমরাও রাজপথে আছি তাদেরকে আটকানোর জন্য। তারা যদি এ ধরনের কোনো কার্যক্রম করে, সেক্ষেত্রে তাদেরকে গ্রেফতারসহ অভিযান চালিয়ে তাদেরকে এই কাজ থেকে বিরত রাখা হচ্ছে।

পল্লবী থানা এলাকার জনসাধারণের পুরোপুরি নিরাপত্তা দিতে পারছে কিনা- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,না,সত্য কথা স্বীকার করতে হয় যে,আসলে এই পল্লবীতে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ লোকের বসবাস করে। সেখানে আমাদের পুলিশের সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ১৫০ জন। তো এত অল্প সংখ্যক লোক দিয়ে এত লোকের পুরোপুরি নিরাপত্তা দেওয়াটা একটু কঠিন। তারপরেও আমাদের এই স্বল্পসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়েই আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার। দুষ্কৃতকারীরা বিভিন্ন পরিকল্পনা করে,তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তো আমরা জানি না। তবে তারা যদি চেষ্টা করে,আমরা প্রতিরোধ করব। তবে বিশেষ করে জনবল এবং যানবাহনের সংখ্যা- লজিস্টিক সাপোর্টটা বাড়লে জনগণের সেবার মানটা আরও বৃদ্ধি পাবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

১৫০ পুলিশের কাঁধে ৭ লাখ মানুষের নিরাপত্তা,অপরাধ দমনে তৎপর পল্লবী থানা

আপডেট: ১১:৩৯:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

মো.দীন ইসলাম, ঢাকা

রাজধানীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত পল্লবী। প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ মানুষের নিরাপত্তায় বিশাল দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৫০ জন পুলিশ সদস্য। ফলে একজন কর্মকর্তাকে গড়ে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে,যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

প্রতিদিন গড়ে ডজনখানেক সাধারণ ডায়েরি (জিডি),নিয়মিত মামলা দায়ের,আসামি গ্রেফতার এবং আদালত সংক্রান্ত কাজ পরিচালনা পল্লবী থানার নিত্যদিনের কাজ। ৫ আগস্ট পরবর্তী নানা অস্থিরতা এবং যানবাহন ও লজিস্টিক সংকট সত্ত্বে সেবার মানসিকতা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে পল্লবী থানা পুলিশ। মাদক নির্মূল,কিশোর গ্যাংয়ের বিলুপ্তি এবং ক্লু-লেস মামলার দ্রুত রহস্য উন্মোচনে থানাটির সাফল্য সর্বত্র প্রশংসিত।

পল্লবী থানা এলাকার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো আটকে পড়া পাকিস্তানি (বিহারী) ক্যাম্পগুলো। ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক বিক্রি ও গ্যাং কালচার নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে নিয়মিত বিশেষ অভিযান চালাতে হয়। কালশী রোড,সাড়ে ১১ নম্বর মোড় এবং বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ও ছিনতাইকারীদের তৎপরতা রোধে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখতে হয়। এছাড়া, মিরপুর ১১ ও ১২ নম্বর এলাকার ব্যস্ত সড়কগুলোতে বাজার ও অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে তৈরি হওয়া যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগের পাশাপাশি থানা পুলিশকেও ভূমিকা রাখতে হয়। পল্লবী থানার এই অদম্য প্রচেষ্টা সাময়িকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও,দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত জনবল ও আধুনিক যানবাহন বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

পল্লবী থানা সূত্রে জানা যায়,অপরাধ দমনে প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া হয় মাদক নির্মূলকে। গত কয়েক মাসে ক্রমান্বয়ে চালানো বিশেষ অভিযানে বিপুল সংখ্যক মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী গ্রেফতার করা হয়েছে। গুটিয়ে দেওয়া হয়েছে আস্তানা। এমনকি টানা অভিযানে ভেঙে গেছে পল্লবীর শীর্ষ মাদক সিন্ডিকেটগুলোর কোমর। গত তিন মাসে (মে থেকে জুলাই) ১ হাজার ৭৯৫ মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী গ্রেফতার করা হয় এবং প্রায় ৫০টি মাদক মামলা করা হয়। সেই সঙ্গে ৬ হাজার ৪০৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট,২২ কেজি ৮৪৫ গ্রাম গাঁজা, ৪০৪ গ্রাম হিরোইন জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া,কিশোরীর প্রেমের টানে ঘর ছাড়া কিশোরীসহ ১৪৮ জন নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছে পল্লবী থানা।

এদিকে,দেশের সার্বিক পরিস্থিতির মতো ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পল্লবী থানাতেও কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তবে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে পুলিশ সদস্যরা সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠে পুরোদমে স্বাভাবিক পুলিশিং শুরু করেছেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ যুবলীগ-ছাত্রলীগের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধেও দৃঢ় তৎপর থানার পুলিশ সদস্যরা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পল্লবী থানার গেটের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও এরপর পুলিশের তৎপরতায় অপ্রীতিকর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ঝটিকা মিছিল বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চালালে কঠোর হাতে তা দমন করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত মে থেকে জুলাই- এই তিন মাসে সরকার বিরোধী ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জরিত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের প্রায় ৩৩ জনকে গ্রেফতার করে পল্লবী থানা পুলিশ। এসময় তাদের থেকে উদ্ধার করা হয় ৬টি পেট্রোল বোমা এবং একটি চায়না অস্ত্র। পল্লবী এলাকায় অপরাধ দমনে তালিকাভুক্ত প্রায় ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ডাকাত ও ছিনতাইকারী চক্রের ১৭ সদস্য,নিয়মিত মামলায় ২৫১ জন এবং ওয়ারেন্টমূলে ৯২৬ জন আসামি গ্রেফতার করা হয়।

তবে পল্লবী এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ছিল কিশোর গ্যাং। বিশেষ করে ‘ভইরা দে’ এবং ‘বাহুবলী গ্যাং’ এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও দেশীয় অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দিত। পল্লবী থানা পুলিশ বিশেষ পরিকল্পনা করে এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালায়। ‘ভইরা দে’ গ্যাং প্রধান আশিকুর রহমান শান্ত ওরফে আশিককে দেশীয় অস্ত্রসহ তার পুরো চক্রকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

‘বাহুবলী গ্যাং’ দলনেতা বাহুবলীকে গ্রেফতার করে আদালতে চালান করা হয়। পল্লবী থেকে বিলুপ্তির পথে কিশোর গ্যাং। এবিষয়ে পল্লবী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাসান বাসির বলেন, পল্লবী এলাকাকে হয়তো শতভাগ মাদক মুক্ত করা কঠিন, তবে কঠোর আইনি পদক্ষেপে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব। আমরা কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিরুদ্ধে কোনো আপস করব না।

অন্যদিকে,পল্লবী থানা পুলিশের সবচেয়ে বেশি দক্ষতা ফুটে ওঠে চাঞ্চল্যকর ‘রামিসা হত্যা’ মামলায়। ঘটনা ঘটার মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে বিজ্ঞ আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়, যা ডিএমপির মধ্যে পুলিশি দক্ষতার এক অনন্য নজির। এমনকি, কাজের এই স্বীকৃতিস্বরূপ কর্মকর্তা চলতি বছরের গত জুন মাসে ডিএমপির শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জ হিসেবে নির্বাচিত হন পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির।

পল্লবী এলাকায় বসবাস করেন প্রায় ৭-৮ লাখ মানুষ,অথচ তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত মাত্র ১৫০ জন পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি পুলিশের যানবাহনের জরাজীর্ণ অবস্থা ও লজিস্টিক সংকট তো রয়েছেই। তবে এই বিপুল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কালশী মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিয়মিত চেকপোস্ট, টহল ও কড়া নজরদারির মাধ্যমে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছে পল্লবী থানা পুলিশ। লজিস্টিক সাপোর্ট ও জনবল আরও বাড়লে সেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।

পল্লবী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাসান বাসির বলেন, আমি গত মে মাসে এখানে যোগদান করি। যোগদান করার পর থেকেই মাদক নির্মূলটাই আমার প্রথম অগ্রাধিকার। সেক্ষেত্রে গত তিন মাসে আমি ১ হাজার ৭৯৫ মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় আনি। সেইসঙ্গে বিপুল মাদকদ্রব্য জব্দ করি।

এছাড়া, মে মাসে আমাদের জন্য রামিসা হত্যা একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার এবং দ্রুত সময়ে মামলাটির তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করি। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জুন মাসে আমি ডিএমপির মধ্যে শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জ নির্বাচিত হই। পল্লবী এলাকায় অপরাধ দমনে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

তিনি বলেন, হয়তো পল্লবীকে মাদক মুক্ত করতে পারব না, তবে মাদকটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব,ইনশাল্লাহ। এখানে কিশোর গ্যাংয়ের একটা তৎপরতা আছে,এটা নিয়েও কাজ করছি। বেশ কিছু কিশোর গ্যাং ধরেছি।

সম্প্রতি ‘ভইরা দে’ নামের পুরো গ্যাংটিকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেফতার করিছে। তারা এক প্রকার নির্মূল হওয়ার পথে। এছাড়া ‘বাহুবলী গ্যাং’ নামের গ্রুপটাও এখন প্রায় নির্মূলের পথে। পল্লবীতে কিশোর গ্যাং,মাদক নির্মূল করার পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি।

৫ আগস্টের ঘটনায় দেখা গেছে যে পুলিশের অনেকেরই মনোবল ভেঙে গিয়েছিল, পল্লবী থানাও এর ব্যতিক্রম না; এখন এই থানার পুলিশ সদস্যদের কর্মতৎপরতা কেমন রয়েছে এবং কোনো অস্ত্র হারিয়ে লুট হয়ে গেলে সেগুলো ফেরত পাওয়া গেছে কি না? জানতে চাইলে হাসান বাসির বলেন, গোটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই একটি প্রভাব পড়েছিল ৫ আগস্টের পরে। তবে সেখান থেকে আমরা উত্তরণের চেষ্টা করেছি এবং বলা যায় এখন আমরা রিকভারি করে ফেলেছি। আমরা নিয়মিতভাবেই স্বাভাবিকভাবে পুলিশিং করছি। আমাদের কিছু অস্ত্র খোয়া গিয়েছিল,গোটা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্টেশন থেকেই খোয়া গিয়েছিল,সেগুলো উদ্ধারে আমরা চেষ্টা করছি। আমরা গত জুন মাসে আমার থানা এলাকা থেকে একটা উদ্ধার করে আমাদের পুলিশ লাইনে জমা দিয়েছি।

পল্লবীতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং অপতৎপরতার বিষয়ে তিনি বলেন,তাদের বিরুদ্ধে আমরা যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে আছি। গত জুলাই মাসেই ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছি একটা ঘটনা থেকে। এছাড়াও অন্যান্য সময়েও মিছিল করার সময় তাদের গ্রেফতার করে অপতৎপরতা রুখে দেওয়া হচ্ছে। তারা চেষ্টা করছে করার, আমরাও রাজপথে আছি তাদেরকে আটকানোর জন্য। তারা যদি এ ধরনের কোনো কার্যক্রম করে, সেক্ষেত্রে তাদেরকে গ্রেফতারসহ অভিযান চালিয়ে তাদেরকে এই কাজ থেকে বিরত রাখা হচ্ছে।

পল্লবী থানা এলাকার জনসাধারণের পুরোপুরি নিরাপত্তা দিতে পারছে কিনা- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,না,সত্য কথা স্বীকার করতে হয় যে,আসলে এই পল্লবীতে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ লোকের বসবাস করে। সেখানে আমাদের পুলিশের সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ১৫০ জন। তো এত অল্প সংখ্যক লোক দিয়ে এত লোকের পুরোপুরি নিরাপত্তা দেওয়াটা একটু কঠিন। তারপরেও আমাদের এই স্বল্পসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়েই আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার। দুষ্কৃতকারীরা বিভিন্ন পরিকল্পনা করে,তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তো আমরা জানি না। তবে তারা যদি চেষ্টা করে,আমরা প্রতিরোধ করব। তবে বিশেষ করে জনবল এবং যানবাহনের সংখ্যা- লজিস্টিক সাপোর্টটা বাড়লে জনগণের সেবার মানটা আরও বৃদ্ধি পাবে।