০৭:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের নথিকে ঢাল করে সংখ্যালঘু পরিবারের ভিটেমাটি দখলের চক্রান্ত, মূল কারিগর আলহাজ্ব গ্রুপের কর্ণধার আব্দুল আলী চক্র

  • আপডেট: ০৬:৩৮:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৮০০৪

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:

রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের নন্দীপাড়া মৌজার ঐতিহাসিক সিএস দাগ নম্বর ৭৬৯-কে কেন্দ্র করে এক হিন্দু পরিবারের দীর্ঘদিনের অর্জিত স্বত্ব ও ভোগদখলীয় ভূসম্পত্তি গ্রাস করার উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্তাল সময়কালের একটি অস্পষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ নথিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ভূস্বামীগোষ্ঠী ‘আলহাজ্ব গ্রুপ’-এর কর্নধার আব্দুল আলী ও তাঁর দোসরদের বিরুদ্ধে এই সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও জোরপূর্বক সম্পত্তি দখলের নীলনকশার আঙুল তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। মূল ঘটনার আনুপূর্বিক পর্যালোচনায় জানা যায়, উক্ত জমিতে স্বত্বাধিকারী হিসেবে মূল ধারক ছিলেন নীরদ বালা দাস। তিনি বিগত ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ জুলাই সম্পাদনা করা ৯২৯২ নম্বরের একটি কবলা দলিলের বিনিময়ে অর্থের জরুরি প্রয়োজনে ৪১ শতক ভূমির পূর্ণ স্বত্ব ও পজিশন হস্তান্তর করেন শ্রী রূপচাঁদ মন্ডল এবং গোপিচাঁদ মন্ডলের অনুকূলে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে রূপচাঁদ মন্ডলের পরলোকগমনের পর তাঁরই ঔরসজাত সন্তান রাম আনন্দ মন্ডল বংশানুক্রমিক ও বৈধ ওয়ারিশ সূত্রে এই স্থাবর সম্পদের একক তদারকি ও ভোগদখলের অধিকার লাভ করেন।
তবে এই বৈধ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জায়গায় নিজের নামজারি বা খতিয়ান খোলার উদ্দেশ্যে স্থানীয় ভূমি কার্যালয়ে গমন করলে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়। রাম আনন্দ জানতে পারেন যে, তাঁর পারিবারিক জমিটি আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড’-এর নামে বেআইনিভাবে মিউটেশন বা নামজারি করিয়ে নেওয়া হয়েছে। অতঃপর ন্যায়বিচারের আশায় তিনি ত্বরিত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে ২৪/২৫ নম্বরের এক মিস কেস রুজু করেন এবং উক্ত অবৈধ নামজারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানান। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর কর্তৃপক্ষ আবাসন কোম্পানির সেই বিতর্কিত খতিয়ান খারিজ করে দেন এবং সর্বশেষ ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ এপ্রিল ডেমরা সার্কেল থেকে ১২৬৯১ (IX-I), ২০২৫-২০২৬ নম্বর আদেশে রাম আনন্দ মন্ডলের নামে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন নামজারি চূড়ান্ত করা হয়।
কিন্তু এই আইনি বিজয়ের পরেই শুরু হয় আসল ষড়যন্ত্র। আলহাজ্ব গ্রুপের কর্ণধার আব্দুল আলী ও তাঁর সহযোগীরা হঠাৎ করেই মাঠে নামেন এবং ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর—অর্থাৎ বাংলাদেশ যখন রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে উত্তাল ও অস্থিতিশীল—ঠিক সেই সময়ে রেজিস্ট্রিকৃত ৭৬৮১ নম্বরের একটি বিতর্কিত দলিল সামনে এনে উক্ত ৪১ শতক জমির মালিকানা দাবি করতে শুরু করেন। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য ও বংশলতিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উল্লিখিত সম্পত্তির আসল গ্রহীতা ছিলেন রূপচাঁদ মন্ডল ও গোপিচাঁদ মন্ডল। তাঁদেরই অপর ভাই লেবুচান মন্ডল কী ক্ষমতার বলে বা কোন অধিকারে আলহাজ্ব গ্রুপের কাছে এই সম্পত্তি হস্তান্তর করলেন, তা নিয়ে বিশাল প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। আইনত ও সামাজিকভাবে লেবুচান মন্ডলের এই সম্পত্তি হস্তান্তরের বিন্দুমাত্র এখতিয়ার বা আইনগত অধিকার ছিল না। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ ও প্রত্যক্ষদর্শীরাও দৃঢ়তার সাথে এ কথা স্পষ্ট করেছেন যে, লেবুচান মন্ডল কখনো উক্ত জমি বিক্রি করা তো দূরের কথা, কোনোপ্রকার বায়নানামা বা চুক্তিপত্রেও স্বাক্ষর করেননি। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ দিনগুলোতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেশত্যাগে বাধ্য করা বা তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তৎকালীন সুবিধাবাদী চক্র যে ভূয়া ও জাল দলিল প্রস্তুত করে সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল, এই ঘটনাটিও তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ বলে ধারণা করছেন ওয়াকিফহাল মহল।
আইনগত দিক পর্যালোচনা করলে আরও দেখা যায়, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ১২ নম্বর আদেশ (PresidentÕs Order No. 12 of 1972) অনুসারে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া নির্দিষ্ট কিছু স্বত্ব হস্তান্তর ও আদালতের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল ও অকার্যকর বলে গণ্য করা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই ৭৬৮১ নম্বর বিতর্কিত দলিলটির আইনগত অস্তিত্ব ও বৈধতা কতটুকু টিকে থাকে, তা আদালতের গভীর তদারকি ও চুলচেরা বিশ্লেষণের দাবী রাখে।
এখানেই শেষ নয়, জমি দখলের এই নীল নকশায় প্রশাসনিক বিভ্রান্তি তৈরির পাঁয়তারাও যুক্ত হয়েছে। ঢাকা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) কার্যালয়ের অধীনে চলমান ৪৮৩/২০২৪ (বা ৪৩৮/২০২৪) নম্বরের মিস আপিল মামলাটি নিয়ে এক চরম অনিয়মের কথা উঠে এসেছে। মূল সূচি অনুযায়ী যেখানে উক্ত মামলার শুনানির নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, অথচ অজ্ঞাত কারণে এবং আইনগত রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্ধারিত তারিখের আগেই অর্থাৎ ১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে একতরফা আদেশ জারি করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল ভুক্তভোগী ও জমির প্রকৃত স্বত্বাধিকারী রাম আনন্দ মন্ডলকে মামলার শুনানিতে কোনোপ্রকার শুনানির সুযোগ বা পক্ষভুক্ত না করেই এই আদেশ দেওয়া হয়, যা চরমভাবে বেআইনি। পরবর্তীতে সেই অসঙ্গতিপূর্ণ আদেশকে ঢাল করে ভূমি অফিস ও ডেমরা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের ওপর চরম রাজনৈতিক ও পেশী শক্তির চাপ প্রয়োগ শুরু করা হয়, যেন রাম আনন্দের নামে বৈধভাবে সম্পন্ন হওয়া নামজারিটি অবিলম্বে রদ বা বাতিল করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিষযটি নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ জাতীয় আদেশের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রশাসনিক এমন অরাজকতার মুখে রাম আনন্দ মন্ডল বাধ্য হয়ে ন্যায়বিচারের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঢাকার ভূমি আপিল বোর্ডে ৩-২১আই/২০২৬ (বা ৩-২১১/২০২৬) নম্বরে একটি রিভিশন মামলা দায়ের করতে বাধ্য হন।
আইনি লড়াই আপিল ও রিভিশন বোর্ডের বিচারালয়ে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও আব্দুল আলী চক্র তাদের জোরজবরদস্তি থামায়নি। তারা একের পর এক অসৎ পন্থায় রাম আনন্দের বৈধ নামজারি বাতিলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। শুধু প্রশাসনিক চাপই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুকের নানা গ্রুপ ও অসত্য তথ্য সম্বলিত প্রচারণার মাধ্যমে ডেমরা সার্কেলের সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ এসিল্যান্ডকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও চাপের মুখে রাখার জন্য এক ঘৃণ্য কুচক্রী তৎপরতা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, ডেমরা সার্কেলের বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকেই এই এলাকাকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য এক আপ্রাণ ও সাহসী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই অনমনীয় সততা, প্রশাসনিক দৃঢ?তা এবং জিরো টলারেন্স নীতির কারণে সাধারণ ভূমিসেবাগ্রহীতারা যেমন স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন। তেমনই তিনি ভূমিদস্যু ও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সার্কেলটিকে একটি স্বচ্ছ ও জনবান্ধব কার্যালয়ে পরিণত করতে শতভাগ সফলও হচ্ছেন। আর ঠিক এই কারণেই দুর্নীতিবাজ এই কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তাদের অন্যায় হাসিল করতে না পেরে এসিল্যান্ডের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার এবং তাঁকে অনৈতিক চাপের মুখে ফেলার জন্য গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমকে অপব্যবহার করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঘটনার জটিলতা এখানেই থমকে নেই। হঠাৎ করেই উক্ত জমির ওপর দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন রাজেশ দাশ এবং তপন কুমার দাস নামের দুই ব্যক্তি। যারা নিজেদেরকে নীরদ বালা দাসের উত্তরাধিকারী বা সন্তান হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু আইনি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, যদি নীরদ বালা দাস ১৯৬০ সালেই ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ জমি রূপচাঁদ ও গোপিচাঁদ মন্ডলের নিকট বিক্রয় করে হস্তান্তর সম্পন্ন করে থাকেন, তবে দীর্ঘ কয়েক দশক পর তাঁর ওয়ারিশরা কীভাবে সেই একই বিক্রিত ভূমির ওপর পুনরায় স্বত্ব দাবি করতে পারেন? এই জাতীয় অসঙ্গতিপূর্ণ দাবি সার্বিক তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি।
বর্তমানে রাম আনন্দ মন্ডল ও তাঁর পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। অভিযোগ রয়েছে, আব্দুল আলী গং-এর প্রত্যক্ষ মদদে রফিকুল ইসলাম, মুরাদসহ একদল ভাড়াটে সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী চক্র ক্রমাগত রাম আনন্দকে সশরীরে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে। ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে এবং বৈধ নামজারি প্রত্যাহারের জন্য মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছে। এই সার্বিক পরিস্থিতিতে কোনো প্রকার প্রভাব, বিপুল অর্থের দাপট কিংবা পেশীশক্তির কাছে নতিস্বীকার না করে ১৯৬০ সালের মূল ৯২৯২ নম্বর দলিল, ১৯৭১ সালের প্রশ্নবিদ্ধ ৭৬৮১ নম্বর দলিল, ইস্টার্ন হাউজিং সম্পর্কিত ২৪/২৫ নম্বর মিস কেসের রায়, ডেমরা সার্কেলের বৈধ নামজারি রেকর্ড, ঢাকার মিস আপিল নম্বর ৪৩৮/২০২৪ এবং ভূমি আপিল বোর্ডের রিভিশন মামলা নম্বর ৩-২১১/২০২৬-এর সমস্ত নথিপত্র নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে। বিচারাধীন এই সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো অসাধু মহল যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা প্রশাসনকে জিম্মি করে জবরদখল ও স্থিতি পরিবর্তন করতে না পারে—সেজন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও শীর্ষ ভূমি প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও সুশীল সমাজ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

মুক্তিযুদ্ধের নথিকে ঢাল করে সংখ্যালঘু পরিবারের ভিটেমাটি দখলের চক্রান্ত, মূল কারিগর আলহাজ্ব গ্রুপের কর্ণধার আব্দুল আলী চক্র

আপডেট: ০৬:৩৮:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:

রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের নন্দীপাড়া মৌজার ঐতিহাসিক সিএস দাগ নম্বর ৭৬৯-কে কেন্দ্র করে এক হিন্দু পরিবারের দীর্ঘদিনের অর্জিত স্বত্ব ও ভোগদখলীয় ভূসম্পত্তি গ্রাস করার উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্তাল সময়কালের একটি অস্পষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ নথিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ভূস্বামীগোষ্ঠী ‘আলহাজ্ব গ্রুপ’-এর কর্নধার আব্দুল আলী ও তাঁর দোসরদের বিরুদ্ধে এই সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও জোরপূর্বক সম্পত্তি দখলের নীলনকশার আঙুল তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। মূল ঘটনার আনুপূর্বিক পর্যালোচনায় জানা যায়, উক্ত জমিতে স্বত্বাধিকারী হিসেবে মূল ধারক ছিলেন নীরদ বালা দাস। তিনি বিগত ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ জুলাই সম্পাদনা করা ৯২৯২ নম্বরের একটি কবলা দলিলের বিনিময়ে অর্থের জরুরি প্রয়োজনে ৪১ শতক ভূমির পূর্ণ স্বত্ব ও পজিশন হস্তান্তর করেন শ্রী রূপচাঁদ মন্ডল এবং গোপিচাঁদ মন্ডলের অনুকূলে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে রূপচাঁদ মন্ডলের পরলোকগমনের পর তাঁরই ঔরসজাত সন্তান রাম আনন্দ মন্ডল বংশানুক্রমিক ও বৈধ ওয়ারিশ সূত্রে এই স্থাবর সম্পদের একক তদারকি ও ভোগদখলের অধিকার লাভ করেন।
তবে এই বৈধ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জায়গায় নিজের নামজারি বা খতিয়ান খোলার উদ্দেশ্যে স্থানীয় ভূমি কার্যালয়ে গমন করলে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়। রাম আনন্দ জানতে পারেন যে, তাঁর পারিবারিক জমিটি আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড’-এর নামে বেআইনিভাবে মিউটেশন বা নামজারি করিয়ে নেওয়া হয়েছে। অতঃপর ন্যায়বিচারের আশায় তিনি ত্বরিত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে ২৪/২৫ নম্বরের এক মিস কেস রুজু করেন এবং উক্ত অবৈধ নামজারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানান। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর কর্তৃপক্ষ আবাসন কোম্পানির সেই বিতর্কিত খতিয়ান খারিজ করে দেন এবং সর্বশেষ ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ এপ্রিল ডেমরা সার্কেল থেকে ১২৬৯১ (IX-I), ২০২৫-২০২৬ নম্বর আদেশে রাম আনন্দ মন্ডলের নামে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন নামজারি চূড়ান্ত করা হয়।
কিন্তু এই আইনি বিজয়ের পরেই শুরু হয় আসল ষড়যন্ত্র। আলহাজ্ব গ্রুপের কর্ণধার আব্দুল আলী ও তাঁর সহযোগীরা হঠাৎ করেই মাঠে নামেন এবং ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর—অর্থাৎ বাংলাদেশ যখন রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে উত্তাল ও অস্থিতিশীল—ঠিক সেই সময়ে রেজিস্ট্রিকৃত ৭৬৮১ নম্বরের একটি বিতর্কিত দলিল সামনে এনে উক্ত ৪১ শতক জমির মালিকানা দাবি করতে শুরু করেন। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য ও বংশলতিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উল্লিখিত সম্পত্তির আসল গ্রহীতা ছিলেন রূপচাঁদ মন্ডল ও গোপিচাঁদ মন্ডল। তাঁদেরই অপর ভাই লেবুচান মন্ডল কী ক্ষমতার বলে বা কোন অধিকারে আলহাজ্ব গ্রুপের কাছে এই সম্পত্তি হস্তান্তর করলেন, তা নিয়ে বিশাল প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। আইনত ও সামাজিকভাবে লেবুচান মন্ডলের এই সম্পত্তি হস্তান্তরের বিন্দুমাত্র এখতিয়ার বা আইনগত অধিকার ছিল না। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ ও প্রত্যক্ষদর্শীরাও দৃঢ়তার সাথে এ কথা স্পষ্ট করেছেন যে, লেবুচান মন্ডল কখনো উক্ত জমি বিক্রি করা তো দূরের কথা, কোনোপ্রকার বায়নানামা বা চুক্তিপত্রেও স্বাক্ষর করেননি। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ দিনগুলোতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেশত্যাগে বাধ্য করা বা তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তৎকালীন সুবিধাবাদী চক্র যে ভূয়া ও জাল দলিল প্রস্তুত করে সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল, এই ঘটনাটিও তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ বলে ধারণা করছেন ওয়াকিফহাল মহল।
আইনগত দিক পর্যালোচনা করলে আরও দেখা যায়, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ১২ নম্বর আদেশ (PresidentÕs Order No. 12 of 1972) অনুসারে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া নির্দিষ্ট কিছু স্বত্ব হস্তান্তর ও আদালতের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল ও অকার্যকর বলে গণ্য করা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই ৭৬৮১ নম্বর বিতর্কিত দলিলটির আইনগত অস্তিত্ব ও বৈধতা কতটুকু টিকে থাকে, তা আদালতের গভীর তদারকি ও চুলচেরা বিশ্লেষণের দাবী রাখে।
এখানেই শেষ নয়, জমি দখলের এই নীল নকশায় প্রশাসনিক বিভ্রান্তি তৈরির পাঁয়তারাও যুক্ত হয়েছে। ঢাকা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) কার্যালয়ের অধীনে চলমান ৪৮৩/২০২৪ (বা ৪৩৮/২০২৪) নম্বরের মিস আপিল মামলাটি নিয়ে এক চরম অনিয়মের কথা উঠে এসেছে। মূল সূচি অনুযায়ী যেখানে উক্ত মামলার শুনানির নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, অথচ অজ্ঞাত কারণে এবং আইনগত রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্ধারিত তারিখের আগেই অর্থাৎ ১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে একতরফা আদেশ জারি করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল ভুক্তভোগী ও জমির প্রকৃত স্বত্বাধিকারী রাম আনন্দ মন্ডলকে মামলার শুনানিতে কোনোপ্রকার শুনানির সুযোগ বা পক্ষভুক্ত না করেই এই আদেশ দেওয়া হয়, যা চরমভাবে বেআইনি। পরবর্তীতে সেই অসঙ্গতিপূর্ণ আদেশকে ঢাল করে ভূমি অফিস ও ডেমরা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের ওপর চরম রাজনৈতিক ও পেশী শক্তির চাপ প্রয়োগ শুরু করা হয়, যেন রাম আনন্দের নামে বৈধভাবে সম্পন্ন হওয়া নামজারিটি অবিলম্বে রদ বা বাতিল করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিষযটি নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ জাতীয় আদেশের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রশাসনিক এমন অরাজকতার মুখে রাম আনন্দ মন্ডল বাধ্য হয়ে ন্যায়বিচারের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঢাকার ভূমি আপিল বোর্ডে ৩-২১আই/২০২৬ (বা ৩-২১১/২০২৬) নম্বরে একটি রিভিশন মামলা দায়ের করতে বাধ্য হন।
আইনি লড়াই আপিল ও রিভিশন বোর্ডের বিচারালয়ে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও আব্দুল আলী চক্র তাদের জোরজবরদস্তি থামায়নি। তারা একের পর এক অসৎ পন্থায় রাম আনন্দের বৈধ নামজারি বাতিলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। শুধু প্রশাসনিক চাপই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুকের নানা গ্রুপ ও অসত্য তথ্য সম্বলিত প্রচারণার মাধ্যমে ডেমরা সার্কেলের সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ এসিল্যান্ডকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও চাপের মুখে রাখার জন্য এক ঘৃণ্য কুচক্রী তৎপরতা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, ডেমরা সার্কেলের বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকেই এই এলাকাকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য এক আপ্রাণ ও সাহসী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই অনমনীয় সততা, প্রশাসনিক দৃঢ?তা এবং জিরো টলারেন্স নীতির কারণে সাধারণ ভূমিসেবাগ্রহীতারা যেমন স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন। তেমনই তিনি ভূমিদস্যু ও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সার্কেলটিকে একটি স্বচ্ছ ও জনবান্ধব কার্যালয়ে পরিণত করতে শতভাগ সফলও হচ্ছেন। আর ঠিক এই কারণেই দুর্নীতিবাজ এই কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তাদের অন্যায় হাসিল করতে না পেরে এসিল্যান্ডের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার এবং তাঁকে অনৈতিক চাপের মুখে ফেলার জন্য গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমকে অপব্যবহার করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঘটনার জটিলতা এখানেই থমকে নেই। হঠাৎ করেই উক্ত জমির ওপর দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন রাজেশ দাশ এবং তপন কুমার দাস নামের দুই ব্যক্তি। যারা নিজেদেরকে নীরদ বালা দাসের উত্তরাধিকারী বা সন্তান হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু আইনি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, যদি নীরদ বালা দাস ১৯৬০ সালেই ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ জমি রূপচাঁদ ও গোপিচাঁদ মন্ডলের নিকট বিক্রয় করে হস্তান্তর সম্পন্ন করে থাকেন, তবে দীর্ঘ কয়েক দশক পর তাঁর ওয়ারিশরা কীভাবে সেই একই বিক্রিত ভূমির ওপর পুনরায় স্বত্ব দাবি করতে পারেন? এই জাতীয় অসঙ্গতিপূর্ণ দাবি সার্বিক তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি।
বর্তমানে রাম আনন্দ মন্ডল ও তাঁর পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। অভিযোগ রয়েছে, আব্দুল আলী গং-এর প্রত্যক্ষ মদদে রফিকুল ইসলাম, মুরাদসহ একদল ভাড়াটে সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী চক্র ক্রমাগত রাম আনন্দকে সশরীরে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে। ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে এবং বৈধ নামজারি প্রত্যাহারের জন্য মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছে। এই সার্বিক পরিস্থিতিতে কোনো প্রকার প্রভাব, বিপুল অর্থের দাপট কিংবা পেশীশক্তির কাছে নতিস্বীকার না করে ১৯৬০ সালের মূল ৯২৯২ নম্বর দলিল, ১৯৭১ সালের প্রশ্নবিদ্ধ ৭৬৮১ নম্বর দলিল, ইস্টার্ন হাউজিং সম্পর্কিত ২৪/২৫ নম্বর মিস কেসের রায়, ডেমরা সার্কেলের বৈধ নামজারি রেকর্ড, ঢাকার মিস আপিল নম্বর ৪৩৮/২০২৪ এবং ভূমি আপিল বোর্ডের রিভিশন মামলা নম্বর ৩-২১১/২০২৬-এর সমস্ত নথিপত্র নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে। বিচারাধীন এই সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো অসাধু মহল যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা প্রশাসনকে জিম্মি করে জবরদখল ও স্থিতি পরিবর্তন করতে না পারে—সেজন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও শীর্ষ ভূমি প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও সুশীল সমাজ।