দেশজুড়ে মাদক পাচারের ২৯৬ রুট, চিহ্নিত ৩৭ জেলা
- আপডেট: ১১:৪১:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৮০০১
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
দেশের ৩৭ জেলার ১৮৭টি উপজেলায় মাদক পাচারের ২৯৬টি রুট চিহ্নিত করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
এসব রুটের বেশির ভাগই ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায়। সীমান্ত পেরিয়ে হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, ট্যাপেন্টাডল, ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক এসব পথে বাংলাদেশে ঢুকছে।
ডিএনসির তালিকা অনুযায়ী, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তবর্তী ৩২ জেলার ৯৮টি উপজেলায় রয়েছে ২৪১টি মাদক পাচারের রুট। এর মধ্যে ভারতের সীমান্তবর্তী ৩০টি জেলা এবং মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী তিনটি জেলা রয়েছে। রাঙামাটি দুই দেশের সঙ্গেই সীমান্তবর্তী।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ৯২ উপজেলার ২১২টি রুট দিয়ে ভারত থেকে হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, ট্যাপেন্টাডল, কোডিনযুক্ত এস্কাফসহ বিভিন্ন ধরনের সিরাপ এবং বিদেশি মদ পাচার হয়ে দেশে ঢোকে। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে ছয় উপজেলার ২৯টি রুটে প্রধানত ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস প্রবেশ করে। এসব রুটে হেরোইন, আফিম ও গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক পাচারের ঝুঁকিও রয়েছে।
এ ছাড়া নৌপথে পটুয়াখালী, বরগুনা ও কক্সবাজারের ১৪টি রুট এবং আকাশপথে দেশের তিনটি বিমানবন্দর মাদক পাচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।
রাজশাহীতে সবচেয়ে বেশি রুট
ডিএনসির তালিকা অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগের মধ্যে মাদক পাচারের সবচেয়ে বেশি রুট রয়েছে রাজশাহী বিভাগে। এ বিভাগের ৩৭ উপজেলায় ৮১টি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগের ৪২ উপজেলায় ৬৪টি, ঢাকা বিভাগের ২৭ উপজেলায় ৪২টি, খুলনা বিভাগের ১৮ উপজেলায় ৩৫টি, রংপুর বিভাগের ২৫ উপজেলায় ২৫টি, সিলেট বিভাগের ১৯ উপজেলায় ২০টি, ময়মনসিংহ বিভাগের ১১ উপজেলায় ১৬টি এবং বরিশাল বিভাগের আট উপজেলায় ১৩টি রুট রয়েছে।
রাজশাহী বিভাগের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাদক পাচারের রুট হিসেবে চিহ্নিত। সম্প্রতি রাজধানীর গাবতলীতে দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে কোডিনযুক্ত ৫৫০ বোতল এস্কাফ ও তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে সোনামসজিদ সীমান্ত থেকে ঢাকায় মাদক আনার তথ্য পায় ডিবি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সোনামসজিদ সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক কানসাট, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও গোদাগাড়ী হয়ে রাজশাহী এবং পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার মহদীপুর এলাকা। এই সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, এস্কাফ সিরাপ, গাঁজা ও বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট-ইনজেকশন পাচারের তথ্য রয়েছে।
কুমিল্লা সীমান্তেও সক্রিয় চক্র
ভারতীয় সীমান্তবর্তী কুমিল্লার বিভিন্ন রুটও মাদক পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে। জেলার আদর্শ সদর, বিবিরবাজার, কটক বাজার, নিশ্চিতপুর, মতিনগর, জামবাড়ি ও বিষ্ণুপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক প্রবেশের তথ্য রয়েছে।
গত ৫ অক্টোবর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম সীমান্ত এলাকায় একটি মাইক্রোবাসে তল্লাশি চালিয়ে ৯০ কেজি গাঁজা ও ৬০ বোতল মদ উদ্ধার করে বিজিবি।
ডিএনসি জানিয়েছে, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, নোয়াখালী, রাজশাহী, পাবনা, সাতক্ষীরা, যশোর ও রংপুরের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করেও ভারত থেকে মাদক পাচার করা হয়।
ইয়াবা-আইসের প্রধান রুট কক্সবাজার
ইয়াবা ও আইস পাচারে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবান সীমান্ত এলাকা বেশি ব্যবহার করা হয়। ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় স্থলপথে ইয়াবা পাচারের ২৯টি রুট রয়েছে। এর মধ্যে ঘুমধুম, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, তমব্রু, কুতুপালং, মরিচ্যা ও গোয়ালিয়াপালং উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া নাফ নদী দিয়ে নৌপথে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় মাদক পাচার করা হয়।
ডিএনসি জানায়, মিয়ানমারের গভীর সমুদ্র থেকে ট্রলারে করে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক বঙ্গোপসাগর হয়ে মহেশখালী, সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়া, চকরিয়া ও পেকুয়ার উপকূলীয় এলাকায় খালাস করা হয়। পরে এসব মাদক চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়।
কক্সবাজারের নাহিরারটেক, কস্তুরাঘাট ও নুনিয়ারছড়া থেকেও মাছ ধরার ট্রলারে করে মাদক মহেশখালী ও কুতুবদিয়া হয়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা ও পতেঙ্গা উপকূলে নেওয়ার তথ্য রয়েছে। কখনো এসব চালান বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা ও আশপাশের এলাকাতেও পৌঁছায়।
এক বছরে সীমান্তে ৪২ হাজার অভিযান
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ৪২ হাজার ২২২টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ১১ হাজার ৯৬৮টি মামলা হয়েছে এবং ১২ হাজার ৩২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অভিযানে জব্দ করা হয়েছে ৮ লাখ ১ হাজার ৫৬৫টি এটিএস-জাতীয় ট্যাবলেট, ২ হাজার ৮৭০ দশমিক ২৩৯ কেজি গাঁজা, ৬ দশমিক ৭৭২ কেজি হেরোইন, ৬ হাজার ৮৯২ বোতল ফেনসিডিল এবং ৮২ হাজার ৯২টি ট্যাপেন্টাডল।
একই সময়ে সারা দেশে ডিএনসির ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪৩টি অভিযানে ২৮ হাজার ৪০৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩০ হাজার ১৬১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযানে জব্দ করা হয়েছে ৪৭ লাখ ৭২ হাজার ১২২টি এটিএস-জাতীয় ট্যাবলেট, ৬ হাজার ৯৩৮ দশমিক ১৩৪ কেজি গাঁজা, ১৮ দশমিক ১০৪ কেজি হেরোইন, ১২ হাজার ২১৯ বোতল ফেনসিডিল এবং ১ লাখ ২০ হাজার ৭৫৪টি ট্যাপেন্টাডল।
তবে ডিএনসির তথ্য বলছে, অভিযানে জব্দ হওয়া মাদকের তুলনায় দেশে প্রবেশ করা মাদকের পরিমাণ আরও বেশি।
সীমান্তে সমন্বিত নজরদারির তাগিদ
ডিএনসির মতে, সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধ করতে উৎস এলাকা, ট্রানজিট পয়েন্ট ও সীমান্ত অতিক্রমের স্থান—এই তিন পর্যায়ে সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে মাদকবিরোধী সহযোগিতার আওতায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ অভিযান ও সীমান্তে সমন্বিত নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ বলেন, চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে, যাতে মাদকের চালান বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই প্রতিরোধ করা যায়।



















