০৭:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬

মতিঝিলের সেই বিতর্কিত কর্মকর্তা রেফাঈ আবিদ, দুর্নীতিবাজ এসিল্যান্ডের প্রাইজ পোস্টিং

  • আপডেট: ০৬:১২:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৮০০৪

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:
সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সেবাপ্রত্যাশীদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং পুরো কার্যালয়কে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করার অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও শাস্তির বদলে পদোন্নতিতুল্য ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পেয়েছেন ৩৮তম ব্যাচের বিতর্কিত কর্মকর্তা সৈয়দ রেফাঈ আবিদ। মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষের মহোৎসব চালানোর পর তাকে বহাল তবিয়তে পদায়ন করা হয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও লোভনীয় দপ্তর এল.এ সাধারণ শাখা এবং এল.এ শাখা ০৪ ও ০৫-এর ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে। গুরুতর অনিয়ম ও ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে কীভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বসানো হলো, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগী সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীরা। সচেতন মহলের মতে অকাট্য অনিয়মের প্রমাণ ও তথ্যবহুল অভিযোগ থাকার পরও এভাবে পুরস্কৃত করা মূলত সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতিকে সরাসরি প্রশ্রয় ও উৎসাহিত দেওয়ারই নামান্তর।
জানা গেছে, বর্তমান ভূমি সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশ বলে রেফাঈ আবিদকে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের এসিল্যান্ড পদ থেকে সরিয়ে সরাসরি ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার এই প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হয়। সংবেদনশীল এই দপ্তরে পদায়ন পেয়ে রেফাঈ আবিদের দুর্নীতির মানসিকতা ও বেপরোয়া ভাব আরও বহু গুণে বেড়ে গেছে। তিনি প্রকাশ্যে দাম্ভিকতা প্রকাশ করে বলে বেড়াচ্ছেন, কেউ আমার কিছুই করতে পারবে না। আমি সবসময় ঊর্ধ্বতনদের ম্যানেজ করেই চলি। এমনকি কোনোরূপ সংকোচ না রেখে তিনি দাবি করছেন যে, বর্তমান ভূমি সচিব তার খুব কাছের মানুষ। এই প্রশাসনিক আশকারাকে কাজে লাগিয়ে নতুন দপ্তরে নিজের আখের গোছাতে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে রেফাঈ আবিদের সীমাহীন অনিয়ম ও লুটের ভয়াবহ চিত্র। তার যোগদানের পর থেকেই পুরো কার্যালয়টি সাধারণ মানুষের জন্য এক মূর্তমান আতঙ্কে রূপ নেয়। সরকারঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি টেবিল মেপে নথিপত্রের জন্য ঘুষের হার নির্ধারণ করেছিলেন, যেখানে বৈধ নথির কোনো মূল্য ছিল না। মতিঝিল ও ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস দুটিকে গ্রাস করেছিল তার প্রত্যক্ষ আশকারায় গড়ে ওঠা বহিরাগত দালাল ও কথিত ওমেদারদের এক বিশাল সিন্ডিকেট।
কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগতদের সমন্বয়ে গঠিত এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে কানুনগো নাজমুল, নামজারি সহকারী খাদিজা, কার্যালয়ের অঘোষিত ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ অফিস সহকারী রাকিব, মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা নূরজাহান, সঞ্জীব ধনিয়া, সার্ভেয়ার মাহমুদুল হাসান, নাজির কাম ক্যাশিয়ার নাসির, পোষ্য ক্যাডার কিরণ, নোয়াখালীর হাসান এবং কথিত ওমেদার ও বহিরাগত দালাল সুমন, বেল্লাল, শুভ, মেহেদী, শাহজালাল, সাগর, রফিক, হাসান, হাবিব, মহসিন, মাহমুদ, মিজান, সাব্বির ও শিশির।
মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দালালি ও ঘুষের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করত সুমন, বেল্লাল, শুভ, মেহেদী, শাহজালাল, সাগর, রফিক ও হাসান। আর ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রাজত্ব চালাত হাবিব, মহসিন, মাহমুদ, মিজান, সাব্বির ও শিশির। এসিল্যান্ডের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীর মতো কাজ করে এই দালাল চক্রটি প্রতিদিন ভূমিমালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায় করত এবং সরাসরি আবিদের টেবিলে পৌঁছে দিত। বছরের পর বছর কর্মকর্তা বদলি হলেও এই রহস্যময় দালাল চক্র কার্যালয়ে অপরিবর্তিত থেকে যায়।
এই সার্কেলের অন্যতম হোতা কানুনগো নাজমুল নামজারি বাণিজ্যের অবৈধ আয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘ডি’ ব্লকে শিল্পপতি হাজী ফুল মিয়ার বিলাসবহুল সম্পত্তি ক্রয় করেছেন। পাশাপাশি কালো টাকা সাদা করতে কেরানীগঞ্জের বাবুবাজার ব্রিজের পাশে নিজের সহোদর বোনের নামে কোটি কোটি টাকার বহুতল ভবন কিনেছেন। পূর্বে বদলি ঠেকাতে নাজমুল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ১৭ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে একই চেয়ারে বহাল থেকেছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে নামজারি সহকারী খাদিজা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মিরপুরের বিতর্কিত সাবেক কমিশনার মানিকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হওয়ায় সেই রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কার্যালয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার সাথে তাল মিলিয়ে এসিল্যান্ডের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ অফিস সহকারী রাকিব অবৈধ লেনদেনের রাজত্ব চালাতেন। স্থানীয় ভূমিদস্যু ও জালিয়াত চক্রের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রাখা এই রাকিবের সবুজ সংকেত ও ঘুষের টাকা ছাড়া কোনো নথিতে হাত দেওয়ার সাহস কারও ছিল না।
ঐ কার্যালয়ে দিনের বেলা সরকারি নিয়মের নাটক চললেও আসল কর্মযজ্ঞ শুরু হতো দাপ্তরিক সময় শেষ হওয়ার পর। রাতের আঁধারে কার্যালয়ের ভেতরের লাইট জ্বালিয়ে চলত অবৈধ নথিপত্রের অনুমোদন আর ঘুষের টাকার বান্ডিল গোনার উৎসব। অপরাধের প্রমাণ লুকাতে কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর মুখ সুকৌশলে অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখা হতো।
মতিঝিল সার্কেল থেকে বিদায় নেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে এসিল্যান্ড রেফাঈ আবিদ শেষবারের মতো আখের গোছাতে ঘুষের হার এক ধাক্কায় ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। অনুসন্ধানে তার তৈরি করা গোপন ‘ঘুষের রেট চার্ট’ পাওয়া গেছে:
‘খ’ তফসিলভুক্ত ফাইল: আগে ৩০,০০০ টাকা থাকলেও বাড়িয়ে করা হয় ৪০,০০০ টাকা।
‘পার্ট এলএ’ ও ‘পার্ট খাস’ জমি অনুমোদন: ১৬,০০০ টাকার স্থলে ২৬,০০০ টাকা।
সাধারণ নামজারি ও মিসকেস: ৮,৫০০ টাকার স্থলে ১৮,৫০০ টাকা (জমির পরিমাণ ১০ শতকের বেশি হলেই তা দ্বিগুণ হয়ে যেত)।
শ্যামপুর এলাকার শিল্প প্লট: ২০,০০০ টাকার জায়গায় ৩০,০০০ টাকা।
সাধারণ আবেদন: সর্বনিম্ন ৫,০০০ টাকার জায়গায় ১৫,০০০ টাকা।
টাকা নিশ্চিত করতে ফাইলে বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। চিহ্ন না থাকলে ফাইল গায়েব করে দেওয়া হতো আর টাকা দিলে অবৈধ কাজও একদিনে হতো। যেমন মতিঝিল মৌজার ৮৭১০ (২৫/২৬) নম্বর নামজারি কেসে এক ব্যক্তির চাচার সম্পত্তিকে নিঃসন্তান দেখিয়ে কোনো সাকসেশন সার্টিফিকেট ছাড়াই জাল নথি জমা দেওয়া হয়। প্রথমে তা নামঞ্জুর করা হলেও পর্দার আড়ালে ৫ লক্ষ টাকার ঘুষের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে অবৈধ সেই নামজারিটি অনুমোদন দেন রেফাঈ আবিদ।
তাছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশ লঙ্ঘন করে নিজের ঘুষের সাম্রাজ্য চালু রাখতে কৌশলে নিজের ভাইকেই এই সার্কেলে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। এর আগে ভূমি সেবা মেলায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রমাণ পাওয়ায় নাজির কাম ক্যাশিয়ার নাসির সাময়িক বরখাস্ত হলেও, এসিল্যান্ড আবিদ তার পোষ্য ক্যাডার কিরণ ও নোয়াখালীর হাসানকে দিয়ে কার্যালয়ের ভেতরে-বাইরে একাধিক ঘুষ কালেকশন পয়েন্ট চালু রেখেছিলেন।
নিজের প্রভাব জাহির করতে তিনি প্রায়ই বলতেন, ডিসি সাহেব নিজে আমাকে ফোন দিয়ে খোঁজখবর নেন এবং আমাকে আরডিসি বানানোর কথাও বলেছেন। নিজেকে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দাবি করার পাশাপাশি তিনি নিজেকে ভবিষ্যতের মন্ত্রী বা সচিবের পিএস বলেও পরিচয় দিতেন।
রেফাঈ আবিদের এই ভয়ংকর দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে ইতিপূর্বে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘সোনালী খবর’-এর প্রথম পাতায় কয়েকটি তথ্যবহুল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে প্রাইজ পোস্টিং দেওয়ায় তিনি আরও অহংকারী হয়ে উঠেছেন। সংবাদ প্রকাশের পর তিনি অনুসন্ধানী প্রতিবেদককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দম্ভভরে বলেছেন যে, তার বিরুদ্ধে পুনরায় খবর প্রকাশ করলে ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যা ব ও পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে প্রতিবেদককে এমন জায়গায় গায়েব করে দেওয়া হবে যে তার লাশও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীল সংস্থাগুলোর নাম অপব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করার এই দুঃসাহস এবং শত দুর্নীতির পরও এমন ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করে সৈয়দ রেফাঈ আবিদ, কানুনগো নাজমুল, আওয়ামী লীগের দোসর খাদিজা ও রাকিবসহ পুরো সিন্ডিকেটের অবৈধ সম্পদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি জানাচ্ছে ভুক্তভোগী জনগণ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

মতিঝিলের সেই বিতর্কিত কর্মকর্তা রেফাঈ আবিদ, দুর্নীতিবাজ এসিল্যান্ডের প্রাইজ পোস্টিং

আপডেট: ০৬:১২:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

মোঃ মনিরুজ্জামান মনির:
সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সেবাপ্রত্যাশীদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং পুরো কার্যালয়কে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করার অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও শাস্তির বদলে পদোন্নতিতুল্য ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পেয়েছেন ৩৮তম ব্যাচের বিতর্কিত কর্মকর্তা সৈয়দ রেফাঈ আবিদ। মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষের মহোৎসব চালানোর পর তাকে বহাল তবিয়তে পদায়ন করা হয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও লোভনীয় দপ্তর এল.এ সাধারণ শাখা এবং এল.এ শাখা ০৪ ও ০৫-এর ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে। গুরুতর অনিয়ম ও ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে কীভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বসানো হলো, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগী সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীরা। সচেতন মহলের মতে অকাট্য অনিয়মের প্রমাণ ও তথ্যবহুল অভিযোগ থাকার পরও এভাবে পুরস্কৃত করা মূলত সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতিকে সরাসরি প্রশ্রয় ও উৎসাহিত দেওয়ারই নামান্তর।
জানা গেছে, বর্তমান ভূমি সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশ বলে রেফাঈ আবিদকে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের এসিল্যান্ড পদ থেকে সরিয়ে সরাসরি ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার এই প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হয়। সংবেদনশীল এই দপ্তরে পদায়ন পেয়ে রেফাঈ আবিদের দুর্নীতির মানসিকতা ও বেপরোয়া ভাব আরও বহু গুণে বেড়ে গেছে। তিনি প্রকাশ্যে দাম্ভিকতা প্রকাশ করে বলে বেড়াচ্ছেন, কেউ আমার কিছুই করতে পারবে না। আমি সবসময় ঊর্ধ্বতনদের ম্যানেজ করেই চলি। এমনকি কোনোরূপ সংকোচ না রেখে তিনি দাবি করছেন যে, বর্তমান ভূমি সচিব তার খুব কাছের মানুষ। এই প্রশাসনিক আশকারাকে কাজে লাগিয়ে নতুন দপ্তরে নিজের আখের গোছাতে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে রেফাঈ আবিদের সীমাহীন অনিয়ম ও লুটের ভয়াবহ চিত্র। তার যোগদানের পর থেকেই পুরো কার্যালয়টি সাধারণ মানুষের জন্য এক মূর্তমান আতঙ্কে রূপ নেয়। সরকারঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি টেবিল মেপে নথিপত্রের জন্য ঘুষের হার নির্ধারণ করেছিলেন, যেখানে বৈধ নথির কোনো মূল্য ছিল না। মতিঝিল ও ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস দুটিকে গ্রাস করেছিল তার প্রত্যক্ষ আশকারায় গড়ে ওঠা বহিরাগত দালাল ও কথিত ওমেদারদের এক বিশাল সিন্ডিকেট।
কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগতদের সমন্বয়ে গঠিত এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে কানুনগো নাজমুল, নামজারি সহকারী খাদিজা, কার্যালয়ের অঘোষিত ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ অফিস সহকারী রাকিব, মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা নূরজাহান, সঞ্জীব ধনিয়া, সার্ভেয়ার মাহমুদুল হাসান, নাজির কাম ক্যাশিয়ার নাসির, পোষ্য ক্যাডার কিরণ, নোয়াখালীর হাসান এবং কথিত ওমেদার ও বহিরাগত দালাল সুমন, বেল্লাল, শুভ, মেহেদী, শাহজালাল, সাগর, রফিক, হাসান, হাবিব, মহসিন, মাহমুদ, মিজান, সাব্বির ও শিশির।
মতিঝিল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দালালি ও ঘুষের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করত সুমন, বেল্লাল, শুভ, মেহেদী, শাহজালাল, সাগর, রফিক ও হাসান। আর ধনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রাজত্ব চালাত হাবিব, মহসিন, মাহমুদ, মিজান, সাব্বির ও শিশির। এসিল্যান্ডের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীর মতো কাজ করে এই দালাল চক্রটি প্রতিদিন ভূমিমালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায় করত এবং সরাসরি আবিদের টেবিলে পৌঁছে দিত। বছরের পর বছর কর্মকর্তা বদলি হলেও এই রহস্যময় দালাল চক্র কার্যালয়ে অপরিবর্তিত থেকে যায়।
এই সার্কেলের অন্যতম হোতা কানুনগো নাজমুল নামজারি বাণিজ্যের অবৈধ আয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘ডি’ ব্লকে শিল্পপতি হাজী ফুল মিয়ার বিলাসবহুল সম্পত্তি ক্রয় করেছেন। পাশাপাশি কালো টাকা সাদা করতে কেরানীগঞ্জের বাবুবাজার ব্রিজের পাশে নিজের সহোদর বোনের নামে কোটি কোটি টাকার বহুতল ভবন কিনেছেন। পূর্বে বদলি ঠেকাতে নাজমুল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ১৭ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে একই চেয়ারে বহাল থেকেছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে নামজারি সহকারী খাদিজা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মিরপুরের বিতর্কিত সাবেক কমিশনার মানিকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হওয়ায় সেই রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কার্যালয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার সাথে তাল মিলিয়ে এসিল্যান্ডের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ অফিস সহকারী রাকিব অবৈধ লেনদেনের রাজত্ব চালাতেন। স্থানীয় ভূমিদস্যু ও জালিয়াত চক্রের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রাখা এই রাকিবের সবুজ সংকেত ও ঘুষের টাকা ছাড়া কোনো নথিতে হাত দেওয়ার সাহস কারও ছিল না।
ঐ কার্যালয়ে দিনের বেলা সরকারি নিয়মের নাটক চললেও আসল কর্মযজ্ঞ শুরু হতো দাপ্তরিক সময় শেষ হওয়ার পর। রাতের আঁধারে কার্যালয়ের ভেতরের লাইট জ্বালিয়ে চলত অবৈধ নথিপত্রের অনুমোদন আর ঘুষের টাকার বান্ডিল গোনার উৎসব। অপরাধের প্রমাণ লুকাতে কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর মুখ সুকৌশলে অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখা হতো।
মতিঝিল সার্কেল থেকে বিদায় নেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে এসিল্যান্ড রেফাঈ আবিদ শেষবারের মতো আখের গোছাতে ঘুষের হার এক ধাক্কায় ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। অনুসন্ধানে তার তৈরি করা গোপন ‘ঘুষের রেট চার্ট’ পাওয়া গেছে:
‘খ’ তফসিলভুক্ত ফাইল: আগে ৩০,০০০ টাকা থাকলেও বাড়িয়ে করা হয় ৪০,০০০ টাকা।
‘পার্ট এলএ’ ও ‘পার্ট খাস’ জমি অনুমোদন: ১৬,০০০ টাকার স্থলে ২৬,০০০ টাকা।
সাধারণ নামজারি ও মিসকেস: ৮,৫০০ টাকার স্থলে ১৮,৫০০ টাকা (জমির পরিমাণ ১০ শতকের বেশি হলেই তা দ্বিগুণ হয়ে যেত)।
শ্যামপুর এলাকার শিল্প প্লট: ২০,০০০ টাকার জায়গায় ৩০,০০০ টাকা।
সাধারণ আবেদন: সর্বনিম্ন ৫,০০০ টাকার জায়গায় ১৫,০০০ টাকা।
টাকা নিশ্চিত করতে ফাইলে বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। চিহ্ন না থাকলে ফাইল গায়েব করে দেওয়া হতো আর টাকা দিলে অবৈধ কাজও একদিনে হতো। যেমন মতিঝিল মৌজার ৮৭১০ (২৫/২৬) নম্বর নামজারি কেসে এক ব্যক্তির চাচার সম্পত্তিকে নিঃসন্তান দেখিয়ে কোনো সাকসেশন সার্টিফিকেট ছাড়াই জাল নথি জমা দেওয়া হয়। প্রথমে তা নামঞ্জুর করা হলেও পর্দার আড়ালে ৫ লক্ষ টাকার ঘুষের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে অবৈধ সেই নামজারিটি অনুমোদন দেন রেফাঈ আবিদ।
তাছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশ লঙ্ঘন করে নিজের ঘুষের সাম্রাজ্য চালু রাখতে কৌশলে নিজের ভাইকেই এই সার্কেলে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। এর আগে ভূমি সেবা মেলায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রমাণ পাওয়ায় নাজির কাম ক্যাশিয়ার নাসির সাময়িক বরখাস্ত হলেও, এসিল্যান্ড আবিদ তার পোষ্য ক্যাডার কিরণ ও নোয়াখালীর হাসানকে দিয়ে কার্যালয়ের ভেতরে-বাইরে একাধিক ঘুষ কালেকশন পয়েন্ট চালু রেখেছিলেন।
নিজের প্রভাব জাহির করতে তিনি প্রায়ই বলতেন, ডিসি সাহেব নিজে আমাকে ফোন দিয়ে খোঁজখবর নেন এবং আমাকে আরডিসি বানানোর কথাও বলেছেন। নিজেকে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দাবি করার পাশাপাশি তিনি নিজেকে ভবিষ্যতের মন্ত্রী বা সচিবের পিএস বলেও পরিচয় দিতেন।
রেফাঈ আবিদের এই ভয়ংকর দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে ইতিপূর্বে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘সোনালী খবর’-এর প্রথম পাতায় কয়েকটি তথ্যবহুল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে প্রাইজ পোস্টিং দেওয়ায় তিনি আরও অহংকারী হয়ে উঠেছেন। সংবাদ প্রকাশের পর তিনি অনুসন্ধানী প্রতিবেদককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দম্ভভরে বলেছেন যে, তার বিরুদ্ধে পুনরায় খবর প্রকাশ করলে ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যা ব ও পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে প্রতিবেদককে এমন জায়গায় গায়েব করে দেওয়া হবে যে তার লাশও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীল সংস্থাগুলোর নাম অপব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করার এই দুঃসাহস এবং শত দুর্নীতির পরও এমন ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করে সৈয়দ রেফাঈ আবিদ, কানুনগো নাজমুল, আওয়ামী লীগের দোসর খাদিজা ও রাকিবসহ পুরো সিন্ডিকেটের অবৈধ সম্পদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি জানাচ্ছে ভুক্তভোগী জনগণ।