১০:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নিরাপত্তা নিয়ে কি ঢাকায় ‘র’ প্রধান?

  • আপডেট: ০৮:৩৮:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৮০০৫

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সম্ভাবনার মধ্যে ঢাকায় এসেছেন ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন। চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে তার এই সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার যোগাযোগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে সফরটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যেই পরাগ জৈনের ঢাকা সফর হচ্ছে। গত জুলাইয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। একই সাক্ষাৎকারে দেশে ফিরলে গ্রেফতার বা প্রাণহানির আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

এরপর গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তার ওই বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে আপত্তি জানানো হয়। ঢাকার অভিযোগ ছিল, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি ছিল বেসরকারি উদ্যোগের এবং এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই ‘র’-প্রধানের ঢাকা সফর নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দাবি করা হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরাকে সামনে রেখে তার নিরাপত্তা এবং দেশে ফেরার পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতেই পরাগ জৈন ঢাকায় এসেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরাগ জৈনের সফরের সময়টি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। কারণ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, তার ভারতে অবস্থান এবং ভারত থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—এসব বিষয় বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তবে সফরের আলোচ্যসূচি প্রকাশ না হওয়ায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে যোগাযোগের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অবশ্য এই সফরের আরেকটি প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। গত মার্চের শুরুতে দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশীদ চৌধুরী দিল্লি সফর করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সফরে তিনি ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন এবং ভারতের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন।

ডিজিএফআই প্রধানের ভারত সফরের বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান তার ভারতীয় সমপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ওই সময় ভারতীয় ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সফরটিকে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছিল, ওই আলোচনায় দুই দেশের ভূখণ্ড যেন অপর পক্ষের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে একটি বোঝাপড়ার বিষয় উঠে আসে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দুই দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে পরাগ জৈনের বর্তমান ঢাকা সফরকে শুধু শেখ হাসিনার নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার সুযোগ নেই বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হিসেবেও তার সফর হতে পারে। দীর্ঘ সীমান্ত, সীমান্ত অপরাধ, মাদক ও অস্ত্র পাচার, জঙ্গিবাদ, আন্তসীমান্ত অপরাধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এসব বিষয়ও এ ধরনের আলোচনায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে শেখ হাসিনার বিষয়টি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু। বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত অনুরোধ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হচ্ছে।

আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকেও দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে তারেক রহমান দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে।

এই বৈঠকের দিনই ঢাকায় ভারতীয় গোয়েন্দাপ্রধানের উপস্থিতি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে যে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার কয়েক দিনের মধ্যেই ‘র’-প্রধানের সফর হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা যদি তার ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরেন, তাহলে তার নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসবে। বিমানবন্দর থেকে তাকে কীভাবে আদালতে নেওয়া হবে, তার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণের পর তাকে কোথায় রাখা হবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী হবে—এসব বিষয় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে আইনের আওতায় আনা পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী চলবে—একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ফলে সম্ভাব্য দেশে ফেরাকে ঘিরে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো আলোচনা হয়ে থাকলে সেটি দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার যোগাযোগের অংশ হতে পারে।

কিন্তু এ মুহূর্তে পরাগ জৈনের সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরাকে সরাসরি যুক্ত করার মতো সরকারি তথ্য নেই বলে সূত্রগুলোর দাবি। বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের সফরের আলোচ্যসূচি সাধারণত প্রকাশ্যে আসে না। ফলে তিনি ঢাকায় এসে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা, দেশে ফেরার সময় বা এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

মার্চে ডিজিএফআই প্রধানের দিল্লি সফরের পর দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, বর্তমান সফরকে তার ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকলেও সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের যোগাযোগ চালু রাখা প্রয়োজন—এমন অবস্থান দুই দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

এর পাশাপাশি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের আরও কয়েকটি বিষয়ও বর্তমানে আলোচনায় রয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গঙ্গার পানি চুক্তি, তিস্তা, জ্বালানি, ভিসা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ—এসব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের সময়ও সীমান্ত নিরাপত্তা ও কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘র’-প্রধানের ঢাকা সফরকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কেন্দ্রিক সফর হিসেবে দেখার আগে এর সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের হাইকমিশনারের বৈঠক, শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার যোগাযোগ—এই তিনটি বিষয়ই সফরটির সময়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পরাগ জৈনের সফরকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার সঙ্গে যুক্ত করে যে দাবি করা হচ্ছে, তা এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে। সরকারি পর্যায় থেকে এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, তার নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্য উদ্বেগ, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-অনুরোধ এবং একই সময়ে ঢাকা-দিল্লির নিরাপত্তা যোগাযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। পরাগ জৈনের সফরে শেখ হাসিনার বিষয়টি আলোচনায় ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সরকারি বক্তব্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে।

এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ‘র’-প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফরের আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তাই সফরটিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তবে সফরের সময় এবং ঢাকা-দিল্লির বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটের কারণে শেখ হাসিনার বিষয়টি আলোচনার সম্ভাব্য ইস্যুগুলোর একটি কি না, তা নিয়ে আগ্রহ থাকছেই।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নিরাপত্তা নিয়ে কি ঢাকায় ‘র’ প্রধান?

আপডেট: ০৮:৩৮:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সম্ভাবনার মধ্যে ঢাকায় এসেছেন ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন। চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে তার এই সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার যোগাযোগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে সফরটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যেই পরাগ জৈনের ঢাকা সফর হচ্ছে। গত জুলাইয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। একই সাক্ষাৎকারে দেশে ফিরলে গ্রেফতার বা প্রাণহানির আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

এরপর গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তার ওই বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে আপত্তি জানানো হয়। ঢাকার অভিযোগ ছিল, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি ছিল বেসরকারি উদ্যোগের এবং এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই ‘র’-প্রধানের ঢাকা সফর নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দাবি করা হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরাকে সামনে রেখে তার নিরাপত্তা এবং দেশে ফেরার পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতেই পরাগ জৈন ঢাকায় এসেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরাগ জৈনের সফরের সময়টি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। কারণ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, তার ভারতে অবস্থান এবং ভারত থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—এসব বিষয় বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তবে সফরের আলোচ্যসূচি প্রকাশ না হওয়ায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে যোগাযোগের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অবশ্য এই সফরের আরেকটি প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। গত মার্চের শুরুতে দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশীদ চৌধুরী দিল্লি সফর করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সফরে তিনি ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন এবং ভারতের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন।

ডিজিএফআই প্রধানের ভারত সফরের বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান তার ভারতীয় সমপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ওই সময় ভারতীয় ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সফরটিকে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছিল, ওই আলোচনায় দুই দেশের ভূখণ্ড যেন অপর পক্ষের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে একটি বোঝাপড়ার বিষয় উঠে আসে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দুই দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে পরাগ জৈনের বর্তমান ঢাকা সফরকে শুধু শেখ হাসিনার নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার সুযোগ নেই বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হিসেবেও তার সফর হতে পারে। দীর্ঘ সীমান্ত, সীমান্ত অপরাধ, মাদক ও অস্ত্র পাচার, জঙ্গিবাদ, আন্তসীমান্ত অপরাধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এসব বিষয়ও এ ধরনের আলোচনায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে শেখ হাসিনার বিষয়টি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু। বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত অনুরোধ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হচ্ছে।

আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকেও দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে তারেক রহমান দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে।

এই বৈঠকের দিনই ঢাকায় ভারতীয় গোয়েন্দাপ্রধানের উপস্থিতি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে যে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার কয়েক দিনের মধ্যেই ‘র’-প্রধানের সফর হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা যদি তার ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরেন, তাহলে তার নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসবে। বিমানবন্দর থেকে তাকে কীভাবে আদালতে নেওয়া হবে, তার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণের পর তাকে কোথায় রাখা হবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী হবে—এসব বিষয় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে আইনের আওতায় আনা পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী চলবে—একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ফলে সম্ভাব্য দেশে ফেরাকে ঘিরে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো আলোচনা হয়ে থাকলে সেটি দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার যোগাযোগের অংশ হতে পারে।

কিন্তু এ মুহূর্তে পরাগ জৈনের সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরাকে সরাসরি যুক্ত করার মতো সরকারি তথ্য নেই বলে সূত্রগুলোর দাবি। বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের সফরের আলোচ্যসূচি সাধারণত প্রকাশ্যে আসে না। ফলে তিনি ঢাকায় এসে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা, দেশে ফেরার সময় বা এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

মার্চে ডিজিএফআই প্রধানের দিল্লি সফরের পর দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, বর্তমান সফরকে তার ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকলেও সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের যোগাযোগ চালু রাখা প্রয়োজন—এমন অবস্থান দুই দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

এর পাশাপাশি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের আরও কয়েকটি বিষয়ও বর্তমানে আলোচনায় রয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গঙ্গার পানি চুক্তি, তিস্তা, জ্বালানি, ভিসা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ—এসব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের সময়ও সীমান্ত নিরাপত্তা ও কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘র’-প্রধানের ঢাকা সফরকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কেন্দ্রিক সফর হিসেবে দেখার আগে এর সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের হাইকমিশনারের বৈঠক, শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার যোগাযোগ—এই তিনটি বিষয়ই সফরটির সময়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পরাগ জৈনের সফরকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার সঙ্গে যুক্ত করে যে দাবি করা হচ্ছে, তা এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে। সরকারি পর্যায় থেকে এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, তার নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্য উদ্বেগ, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-অনুরোধ এবং একই সময়ে ঢাকা-দিল্লির নিরাপত্তা যোগাযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। পরাগ জৈনের সফরে শেখ হাসিনার বিষয়টি আলোচনায় ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সরকারি বক্তব্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে।

এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ‘র’-প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফরের আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তাই সফরটিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তবে সফরের সময় এবং ঢাকা-দিল্লির বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটের কারণে শেখ হাসিনার বিষয়টি আলোচনার সম্ভাব্য ইস্যুগুলোর একটি কি না, তা নিয়ে আগ্রহ থাকছেই।