১২:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

মারধর-অসদাচরণসহ প্রায় ২০ অভিযোগ,তবুও বিমানের চাকরিতে জহিরুল

  • আপডেট: ১০:২১:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৮০০৩

মো.দীন ইসলাম,ঢাকা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের (বিএফসিসি) জুনিয়র শেফ বা কমিস জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সহকর্মীকে মারধর,গালাগাল,ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ,কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গসহ একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ,সতর্কপত্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও রয়েছে বিমানের নথিতে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি,সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রায় ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এত অভিযোগের পরও তিনি কীভাবে দীর্ঘদিন চাকরিতে বহাল রয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এবার জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সহকর্মীকে মারধরের একটি সিসিটিভি ফুটেজ এসেছে মিডিয়ার হাতে। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছেন তিনি।

সিসিটিভিতে মারধরের দৃশ্য

মিডিয়ার হাতে আসা বিএফসিসির ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক কর্মীর সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে এক ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে আক্রমণ করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথির তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি বিএফসিসির কমিস বা জুনিয়র শেফ জহিরুল ইসলাম।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাটি গত বছরের ১৬ আগস্টের।

অভিযোগ রয়েছে, মারধরের সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্য সহকর্মীরা এগিয়ে এলে তাদের সঙ্গেও অসদাচরণ ও গালাগাল করেন জহিরুল।

ঘটনা সেখানেই শেষ হয়নি। সহকর্মীকে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাকে বিএফসিসির চিফ শেফের কক্ষে ডাকা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও তিনি উত্তেজিত হয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন।

একপর্যায়ে ভুক্তভোগী কর্মীর দিকে আবারও তেড়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ পৌঁছায় বলাকায়, শুরু হয় তদন্ত

সহকর্মীকে মারধর ও পরবর্তী অসদাচরণের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রধান কার্যালয় বলাকায় পৌঁছায়। এরপর বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় বিভাগীয় তদন্ত।

মিডিয়ার হাতে আসা তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর লিখিত বক্তব্য এবং তদন্ত কার্যক্রমের রেকর্ড রয়েছে।

তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাক্ষ্য ও বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তবে সহকর্মীকে মারধরের ঘটনাই জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা প্রথম অভিযোগ নয়।

অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ

মিডিয়ার হাতে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নথিতে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ, সতর্কপত্র, সাময়িক বরখাস্তসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য রয়েছে।

অভিযোগের ধরনও বিভিন্ন। কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিমান প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময়ে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায় ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এত অভিযোগ, নোটিশ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরও একই কর্মীর বিরুদ্ধে বারবার একই ধরনের অভিযোগ কেন উঠছে এবং কীভাবে তিনি চাকরিতে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছেন—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

খাবারে পোকা পাওয়ার বিতর্কের মধ্যেই মারধরের ফুটেজ

সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের যাত্রীদের জন্য বিএফসিসিতে প্রস্তুত করা খাবারে পোকা পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই বিএফসিসির ভেতরে কর্মীকে মারধর ও বিশৃঙ্খলার সিসিটিভি ফুটেজ সামনে এলো।

জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও খাদ্য প্রস্তুত ও তদারকিতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। তবে খাবারে পোকা পাওয়ার ঘটনায় কার বা কাদের দায় রয়েছে, সেটি তদন্তের বিষয়।

আওয়ামী লীগ আমলেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ

জহিরুল ইসলামের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি আওয়ামী শ্রমিক লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনটির কার্যক্রমে আর্থিক সহযোগিতা করতেন।

মিডিয়ার হাতে আসা জহিরুল ইসলামের পুরোনো কয়েকটি পে-স্লিপে বেতন থেকে সংগঠন-সংশ্লিষ্ট খাতে অর্থ কর্তনের তথ্য দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই অর্থ শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দেওয়া হতো।

এমনকি অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, বিমান থেকে শ্রমিক লীগকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রে জহিরুল অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন।

তবে পে-স্লিপে অর্থ কর্তনের তথ্য থাকলেও ওই অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য কী ছিল কিংবা অন্য কর্মীদের তুলনায় জহিরুলই সর্বোচ্চ অর্থদাতা ছিলেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে কর্মস্থলেও প্রভাব বিস্তার করতেন জহিরুল।

মিডিয়ার হাতে আসা একটি ছবিতে সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীর সঙ্গে তাকে দেখা যায়।

অভিযোগকারীদের দাবি, শ্রমিক লীগের পরিচয়েই তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে এবং সেই রাজনৈতিক যোগাযোগ কর্মক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করা হতো।

তবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ছবি থাকা বা ব্যক্তিগত পরিচয় থাকাই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ নয়।

এখন শ্রমিক দলের আহ্বায়ক

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জহিরুল ইসলামের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে চাকরিরত থাকা অবস্থায় তিনি বর্তমানে ঢাকা মহানগরের দক্ষিণখান থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক পদে রয়েছেন।

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েও কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শ্রমিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও আর্থিক সহযোগিতার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শ্রমিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার তথ্য—দুই সময়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনের পদে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কোন নির্দিষ্ট চাকরিবিধির লঙ্ঘন কি না, সেটি অবশ্য সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার বিষয়।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে জহিরুল ইসলাম বলেন,তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি এগুলোকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন।

তবে সিসিটিভি ফুটেজে সহকর্মীর সঙ্গে শারীরিক সংঘাতের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে উত্তপ্ত আচরণ করেন এবং ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত, তদন্ত শেষ পর্যায়ে

বিমান প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। সর্বশেষ অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে।

তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

একজন জুনিয়র পর্যায়ের কর্মীর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর মারধর, অসদাচরণ, অনুপস্থিতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গসহ একের পর এক অভিযোগ, কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কেন একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠছে—এখন সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এর সঙ্গে বিগত সরকারের সময়ে শ্রমিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও আর্থিক সহযোগিতার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শ্রমিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার বিষয়টিও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

চলমান বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগগুলোর কতটি প্রমাণিত হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিমান কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

মারধর-অসদাচরণসহ প্রায় ২০ অভিযোগ,তবুও বিমানের চাকরিতে জহিরুল

আপডেট: ১০:২১:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

মো.দীন ইসলাম,ঢাকা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের (বিএফসিসি) জুনিয়র শেফ বা কমিস জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সহকর্মীকে মারধর,গালাগাল,ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ,কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গসহ একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ,সতর্কপত্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও রয়েছে বিমানের নথিতে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি,সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রায় ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এত অভিযোগের পরও তিনি কীভাবে দীর্ঘদিন চাকরিতে বহাল রয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এবার জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সহকর্মীকে মারধরের একটি সিসিটিভি ফুটেজ এসেছে মিডিয়ার হাতে। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছেন তিনি।

সিসিটিভিতে মারধরের দৃশ্য

মিডিয়ার হাতে আসা বিএফসিসির ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক কর্মীর সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে এক ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে আক্রমণ করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথির তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি বিএফসিসির কমিস বা জুনিয়র শেফ জহিরুল ইসলাম।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাটি গত বছরের ১৬ আগস্টের।

অভিযোগ রয়েছে, মারধরের সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্য সহকর্মীরা এগিয়ে এলে তাদের সঙ্গেও অসদাচরণ ও গালাগাল করেন জহিরুল।

ঘটনা সেখানেই শেষ হয়নি। সহকর্মীকে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাকে বিএফসিসির চিফ শেফের কক্ষে ডাকা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও তিনি উত্তেজিত হয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন।

একপর্যায়ে ভুক্তভোগী কর্মীর দিকে আবারও তেড়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ পৌঁছায় বলাকায়, শুরু হয় তদন্ত

সহকর্মীকে মারধর ও পরবর্তী অসদাচরণের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রধান কার্যালয় বলাকায় পৌঁছায়। এরপর বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় বিভাগীয় তদন্ত।

মিডিয়ার হাতে আসা তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর লিখিত বক্তব্য এবং তদন্ত কার্যক্রমের রেকর্ড রয়েছে।

তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাক্ষ্য ও বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তবে সহকর্মীকে মারধরের ঘটনাই জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা প্রথম অভিযোগ নয়।

অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ

মিডিয়ার হাতে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নথিতে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ, সতর্কপত্র, সাময়িক বরখাস্তসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য রয়েছে।

অভিযোগের ধরনও বিভিন্ন। কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিমান প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময়ে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায় ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এত অভিযোগ, নোটিশ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরও একই কর্মীর বিরুদ্ধে বারবার একই ধরনের অভিযোগ কেন উঠছে এবং কীভাবে তিনি চাকরিতে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছেন—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

খাবারে পোকা পাওয়ার বিতর্কের মধ্যেই মারধরের ফুটেজ

সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের যাত্রীদের জন্য বিএফসিসিতে প্রস্তুত করা খাবারে পোকা পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই বিএফসিসির ভেতরে কর্মীকে মারধর ও বিশৃঙ্খলার সিসিটিভি ফুটেজ সামনে এলো।

জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও খাদ্য প্রস্তুত ও তদারকিতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। তবে খাবারে পোকা পাওয়ার ঘটনায় কার বা কাদের দায় রয়েছে, সেটি তদন্তের বিষয়।

আওয়ামী লীগ আমলেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ

জহিরুল ইসলামের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি আওয়ামী শ্রমিক লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনটির কার্যক্রমে আর্থিক সহযোগিতা করতেন।

মিডিয়ার হাতে আসা জহিরুল ইসলামের পুরোনো কয়েকটি পে-স্লিপে বেতন থেকে সংগঠন-সংশ্লিষ্ট খাতে অর্থ কর্তনের তথ্য দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই অর্থ শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দেওয়া হতো।

এমনকি অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, বিমান থেকে শ্রমিক লীগকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রে জহিরুল অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন।

তবে পে-স্লিপে অর্থ কর্তনের তথ্য থাকলেও ওই অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য কী ছিল কিংবা অন্য কর্মীদের তুলনায় জহিরুলই সর্বোচ্চ অর্থদাতা ছিলেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে কর্মস্থলেও প্রভাব বিস্তার করতেন জহিরুল।

মিডিয়ার হাতে আসা একটি ছবিতে সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীর সঙ্গে তাকে দেখা যায়।

অভিযোগকারীদের দাবি, শ্রমিক লীগের পরিচয়েই তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে এবং সেই রাজনৈতিক যোগাযোগ কর্মক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করা হতো।

তবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ছবি থাকা বা ব্যক্তিগত পরিচয় থাকাই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ নয়।

এখন শ্রমিক দলের আহ্বায়ক

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জহিরুল ইসলামের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে চাকরিরত থাকা অবস্থায় তিনি বর্তমানে ঢাকা মহানগরের দক্ষিণখান থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক পদে রয়েছেন।

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েও কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শ্রমিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও আর্থিক সহযোগিতার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শ্রমিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার তথ্য—দুই সময়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনের পদে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কোন নির্দিষ্ট চাকরিবিধির লঙ্ঘন কি না, সেটি অবশ্য সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার বিষয়।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে জহিরুল ইসলাম বলেন,তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি এগুলোকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন।

তবে সিসিটিভি ফুটেজে সহকর্মীর সঙ্গে শারীরিক সংঘাতের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে উত্তপ্ত আচরণ করেন এবং ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত, তদন্ত শেষ পর্যায়ে

বিমান প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। সর্বশেষ অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে।

তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

একজন জুনিয়র পর্যায়ের কর্মীর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর মারধর, অসদাচরণ, অনুপস্থিতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গসহ একের পর এক অভিযোগ, কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কেন একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠছে—এখন সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এর সঙ্গে বিগত সরকারের সময়ে শ্রমিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও আর্থিক সহযোগিতার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শ্রমিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার বিষয়টিও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

চলমান বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগগুলোর কতটি প্রমাণিত হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিমান কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।