ঢাকা ডিসি অফিসের এলএ শাখা-৩ এ দুর্নীতির পাহাড়, মাস্টারমাইন্ড রেফাঈ আবিদ ও সার্ভেয়ার মজিবুল,
- আপডেট: ১০:৩৯:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৮০০৭
দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষায় স্বয়ং জেলা প্রসাশক
মোঃ মনিরুজ্জামান মনির :
প্রজাতন্ত্রের সার্ভিস রুলস ও সরকারি সেবামূলক বিধিমালাকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেল থেকে শুরু করে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা পর্যন্ত একচ্ছত্র লুণ্ঠনের চারণভূমি বানিয়ে ফেলেছেন ৩৮তম ব্যাচের বিতর্কিত কর্মকর্তা মতিঝিলের সাবেক এসিল্যান্ড সৈয়দ রেফাঈ আবিদ এবং ঢাকা ডিসি অফিসের দুর্নীতির মূল কারিগর খ্যাত সার্ভেয়ার মজিবুল হক। মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সেবাপ্রত্যাশীদের পদে পদে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং পুরো সার্কেলকে ঘুষের আখড়ায় পরিণত করার পর শত শত দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রেফাঈ আবিদকে কোনো ধরনের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। উল্টো সরকারি অসাধু আমলাতন্ত্রকে সুকৌশলে ম্যানেজ করে এবং বর্তমান ভূমি সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদের পরম আস্থাভাজন ও প্রিয় ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে জাহির করে তিনি বাগিয়ে নিয়েছেন পদোন্নতিতুল্য তথাকথিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’। তাকে মতিঝিল থেকে বদলি করে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর ও অর্থ লেনদেনের দিক থেকে অতি লোভনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত ভূমি অধিগ্রহণ শাখা-৩-এ ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
ভূমি দপ্তরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতাপ্রবণ জায়গা হিসেবে পরিচিত এই অধিগ্রহণ শাখায় যোগদানের পর রেফাঈ আবিদের দুর্নীতির মানচিত্র ও বেপরোয়া ভাব বহু গুণে বেড়ে গেছে। কারণ সেখানে গিয়ে তিনি পেয়ে যান আরেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা সার্ভেয়ার মজিবুল হককে। এরপর রেফাঈ আবিদ ও সার্ভেয়ার মজিবুল হক হাত মিলিয়ে গড়ে তোলেন ১৭ জনের এক বিশাল ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। এই ১৭ জনের সিন্ডিকেটের কাছে বর্তমানে পুরো ঢাকা জেলার হাজার হাজার সাধারণ ভূমি মালিক সম্পূর্ণ জিম্মি হয়ে পড়েছেন। চক্রটির ক্ষমতার দাপট ও প্রশাসনিক হুমকির কাছে সাধারণ মানুষ এতটাই অসহায় হয়ে পড়েছে যে, কেউ তাদের অনিয়ম ও প্রকাশ্য লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছে না।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান হোতা সার্ভেয়ার মজিবুল হকের দুর্নীতি ও জালিয়াতির আদ্যোপান্ত। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেঁকে বসা এই মজিবুল হক মূলত ভূমি অধিগ্রহণ শাখার পুরো ঘুষের চাকা সচল রাখেন। তিনি ও তার ক্যাডার বাহিনী মেগা প্রকল্পগুলোর বিপরীতে অধিগ্রহণকৃত জমির ফাইল আটকে রেখে সাধারণ অ্যাওয়ার্ডি বা ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায় করেন। কোনো ফাইল তার টেবিলে আসলে শুরুতেই বিভিন্ন কাল্পনিক আইনি জটিলতা, নামজারির ভুল বা সিএস-আরএস সংক্রান্ত জটিলতা দাঁড় করিয়ে গ্রাহকদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরবর্তীতে ১ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষের চুক্তি সম্পন্ন হলেই সেই ফাইল রাতারাতি আলোর মুখ দেখে। ভুয়া মালিক সাজানো, ওভারল্যাপিং অর্থাৎ পূর্বে অধিগ্রহণ করা সরকারি জমিকে পুনরায় ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে বিল প্রস্তুত করা এবং খাস জমি ব্যক্তিমালিকানায় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ বিল ছাড়ের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেন এই সার্ভেয়ার মজিবুল।
ঢাকা জেলার বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য অধিগ্রহণ করা ভূমির মালিকদের সরকারি ক্ষতিপূরণের বিল ছাড় করতে গিয়ে রেফাঈ আবিদ ও সার্ভেয়ার মজিবুল হকের এই ১৭ জনের সিন্ডিকেট প্রকাশ্য দরদাম করে ঘুষ দাবি করে আসছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌজায় তাদের এই ভয়ংকর চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলিং চরমে পৌঁছেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—মৌজা: ব্রাহ্মণ চিরন, রাজারবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও দক্ষিণ উলুন (যার এলএ কেস নম্বর ১৭/২৩-২৪), মৌজা: কালাপুর ও দ্বিমুখা (এলএ কেস নম্বর ১৫/২৩-২৪) এবং মৌজা: বাড্ডা (এলএ কেস নম্বর ০৭/২৩-২৪)। এসব মৌজার কোটি কোটি টাকার অধিগ্রহণ বিল আটকে রেখে প্রকৃত ভূমি মালিকদের ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। ঘুষের নির্ধারিত টাকা না দিলে ফাইলে নানান অনিয়মের অজুহাত তুলে বিল স্থগিত রাখা হচ্ছে, আর মোটা অঙ্কের ঘুষের টাকা হাতে পৌঁছামাত্রই সমস্ত জটিলতা দূর করে এক ঘণ্টার মধ্যে ফাইল পাস করে দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে যে, বিগত মাত্র এক মাসে উল্লিখিত এসব মৌজায় ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা বিলে স্বাক্ষর করে প্রদান করা হয়েছে। আর এই ২০ কোটি টাকার বিশাল বিল ছাড় করার সুযোগকে ষোলআনা কাজে লাগিয়ে রেফাঈ আবিদ ও সার্ভেয়ার মজিবুল হকের সিন্ডিকেট ১ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রকাশ্য ও পরোক্ষ ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে এক মাসের মধ্যেই হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। এই কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের সিংহভাগ চলে গেছে রেফাঈ আবিদ ও সার্ভেয়ার মজিবুল হকের নিজস্ব ব্যাংক হিসাব ও তাদের অনুসারীদের পকেটে।
বিশেষ অনুসন্ধানে জানা যায়, সার্ভেয়ার মজিবুল হক কেবল প্রশাসনিক বলয়ই নয়, বরং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভেঙে অফিসে নিজের এক একক রাজত্ব গড়ে তুলেছেন। মজিবুল ভুক্তভোগী সেবাপ্রত্যাশী ও সহকর্মীদের কাছে প্রকাশ্যে অহংকার করে জাহির করেন যে, স্বয়ং জেলা প্রশাসক (ডিসি) সাহেব নিজেই তাকে সমস্ত আইনি, প্রশাসনিক ও বিভাগীয় প্রটেকশন দেন। তিনি দম্ভ করে বলেন, ‘ডিসি সাহেব আমার মাথার ওপর হাত রেখেছেন, কোনো সাংবাদিক বা দুদকের তদন্ত আমার কিছুই করতে পারবে না।’ জেলা প্রশাসকের নাম অপব্যবহার করে মজিবুল ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় এক অঘোষিত আতঙ্ক ও ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে নিরবে চোখের জল ফেলছেন। রেফাঈ আবিদ ও সার্ভেয়ার মজিবুল হকের ক্ষমতার দাপট ও সিন্ডিকেটের প্রতাপ এতটাই ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে যে, কার্যালয়ের অন্য কোনো কর্মচারীর তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই।
এর আগে মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলে এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও সৈয়দ রেফাঈ আবিদ গড়ে তুলেছিলেন এক ভয়ংকর দুর্নীতি সাম্রাজ্য। সেখানে তিনি প্রতিটি দাপ্তরিক ফাইলের জন্য টেবিল মেপে গোপন ‘ঘুষের রেট চার্ট’ তৈরি করে রেখেছিলেন। যেখানে খ-তফসিলভুক্ত ফাইল, পার্ট এলএ, পার্ট খাস জমি এবং সাধারণ নামজারির জন্য আলাদা আলাদা নির্ধারিত রেটে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। সাধারণ সেবা নিতে আসা নাগরিকদের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও টাকা না দিলে ফাইল গায়েব বা বাতিল করে দেওয়া হতো। আর তাদের চাহিদামতো মোটা অঙ্কের ঘুষের টাকা দিলে সব ধরনের জাল কাগজপত্রেও অবৈধ নামজারি অনুমোদন করে দেওয়া হতো। মতিঝিলে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অকাট্য প্রমাণ মেলে এবং সেসময় ভূমি সেবা মেলায় প্রকাশ্য ঘুষ নেওয়ার অপরাধে তার ঘনিষ্ঠ কর্মচারীরা বরখাস্ত হলেও মূল হোতা রেফাঈ আবিদ তার অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে সবসময় অধরা থেকে যান।
মতিঝিলের সেই চরম দুর্নীতির খতিয়ান ও বর্তমান ভূমি অধিগ্রহণ শাখা-৩-এ রেফাঈ আবিদ ও সার্ভেয়ার মজিবুল হকের ১৭ জনের মেগা সিন্ডিকেটের এই সর্বগ্রাসী লুণ্ঠন নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক ‘সোনালী খবর’সহ বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে একাধিক অনুসন্ধানী তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হয়। একের পর এক তোলপাড় সৃষ্টি করা সংবাদ প্রকাশের পরও থেমে নেই এই সিন্ডিকেটের ঘুষ বাণিজ্য। সংবাদ প্রকাশের পর তারা তাদের বেপরোয়া আচরণ ও লুণ্ঠন থামানোর বদলে আরও বেশি অহংকারী হয়ে উঠেছেন এবং জিম্মি করা ভূমি মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের পরিমাণ ও দরদাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন।
তবে তাদের এই সীমাহীন অপরাধ ও প্রকাশ্যে সরকারি অর্থ লুটের বিষয়টির মাত্রা এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তা শেষ পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে রেফাঈ আবিদ ও সার্ভেয়ার মজিবুল হকের অঢেল অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার ও বিভিন্ন মৌজার অধিগ্রহণ বিল ছাড়ের নামে পরিচালিত কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তে নেমেছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা ও দুর্নীতি দমনকারী সংস্থাসহ ভুমি মন্ত্রনালয়। রেফাঈ আবিদ ও মজিবুল হকের বিরুদ্ধে ভূমি মন্ত্রণালয়, ভূমি সংস্কার বোর্ড এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এর প্রেক্ষিতে তাদের এসব প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অবৈধ সম্পদের বিস্তারিত অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে বিভাগীয় ও আইনি তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ভুক্তভোগী সাধারণ ভূমি মালিক ও সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই দুই দুর্নীতিবাজ চক্রের মূল হোতা—সাবেক এসিল্যান্ড রেফাঈ আবিদকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে ওএসডি করে অন্যত্র সরিয়ে দেয়া এবং সার্ভেয়ার মজিবুল হককে তার নিজ জেলায় সরিয়ে দিয়ে তাদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত কোটি কোটি টাকার সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহল ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন ভুক্তভোগী ভুমি সেবাপ্রত্যাশিরা। তাছাড়া রেফাঈ আবিদ ও মজিবুল সিন্ডিকেটের ১৭ জনের নামসহ বিস্তারিত তুলে ধরা হবে আগামী বিশেষ অনুসন্ধানী পর্বে।



















