০৪:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত নামে খ্যাত’ পিআইও তদন্ত ৩ চোরদের হাতে

  • আপডেট: ০৩:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৮০০৩

আতিকুর রহমান আতিক বিশেষ প্রতিনিধি:

গরিবের জন্য সরকারি ত্রাণ। বস্তায় চাল-ডাল-তেল-লবণ-চিনি সবই আছে। শুধু যেন নেই হিসাবের খাতা! অফিস ছুটির পর ত্রাণের বস্তা মাইক্রোবাসে উঠছে, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, আর ২৭৫ বস্তা শুকনো খাবারের হিসাব চাইলে সংশ্লিষ্টদের মুখে যেন তালা!

ঘটনার পর স্থানীয়দের ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মাইদুল ইসলামকে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত খ্যাত’ পিআইও বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। অবশ্য এটি স্থানীয়দের দেওয়া আখ্যা অভিযোগের সত্যতা ও দায়-দায়িত্ব তদন্তেই নির্ধারিত হবে। ঘটনা নিয়ে এবার প্রশাসনেরও টনক নড়েছে। পিআইওর বিরুদ্ধে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাহফুজার রহমান মাহফুজ। সদস্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন ও উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান।

গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সরকারি অফিস ছুটির পর উপজেলা অফিসার্স কল্যাণ ক্লাবের স্টোররুম থেকে মাইক্রোবাসে করে সরকারি শুকনো খাবারের বস্তা নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ব্যস! ভিডিও ছড়াতেই শুরু প্রশ্নের বন্যা। অফিস ছুটি হলে মানুষ বাড়ি ফেরে, আর সরকারি ত্রাণের বস্তা যায় মাইক্রোবাসে এ কেমন ‘অফিস টাইম’?

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, পিআইও মো. মাইদুল ইসলামের উদ্যোগে তাঁর আত্মীয়স্বজনকে ডেকে স্টোররুম থেকে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দকৃত শুকনো খাবারের বস্তা মাইক্রোবাসে করে সরিয়ে নেওয়া হয়।বস্তা গেল কোথায়? কার হাতে গেল? কার নির্দেশে গেল? কেন অফিস ছুটির পর গেল? কোন রেজিস্টারে গেল?আর শেষ পর্যন্ত গরিবের ঘরে গেল তো? জরুরি ত্রাণ সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ২৭৫ বস্তা শুকনো খাবার।

প্রতিটি বস্তায় ১০ কেজি চাল, ১ কেজি মসুর ডাল, ১ কেজি লবণ, ১ কেজি চিনি, ১ লিটার সয়াবিন তেল, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়ার গুঁড়া রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিটি বস্তার ওজন ১৪ দশমিক ৩৫ কেজি। অর্থাৎ গরিবের ঘরে যাওয়ার কথা ছিল খাবার। কিন্তু এখন প্রশ্ন খাবার গেছে কোথায়? পিআইও কার্যালয়ে ২৭৫ বস্তার বরাদ্দ ও বিতরণসংক্রান্ত নথি দেখতে চাওয়া হয়। চাওয়া হয় বিতরণের মাস্টাররোল ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা সেগুলো দেখাতে পারেননি। এ যেন এক অদ্ভুত হিসাব!বস্তা আছে,হিসাব নেই। বরাদ্দ আছে,নথি নেই। ত্রাণ আছে,গন্তব্যের পরিষ্কার তথ্য নেই।

স্থানীয়দের রসিক প্রশ্ন, ২৭৫ বস্তা ত্রাণ কি গরিবদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে, নাকি হিসাবের খাতায় বসেই সবাই ত্রাণ খেয়ে ফেলেছে? পিআইওর জবাব ‘আমি কিছু বলবো না!’ অভিযোগের বিষয়ে পিআইও মো. মাইদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তাঁর জবাব, আমি কিছু বলবো না। ইউএনওকে জিজ্ঞেস করেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ইউএনও কি সরকারি শুকনো খাবার কালোবাজারে বিক্রি করতে বলেছেন? এই প্রশ্নেও কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

ফলে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়,যদি সবকিছু নিয়মমাফিক হয়, তাহলে হিসাব দেখাতে আপত্তি কোথায়? আর যদি হিসাব থাকে, তাহলে হিসাব দেখাতে এত অনীহা কেন? অবশ্য এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে। ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত’ নামের পেছনে কী?

স্থানীয়দের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে পিআইওকে ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত খ্যাত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারি সম্পদ নিয়ে যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি দপ্তরের সমস্যা নয় ,এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রশ্ন। তবে ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত’ কোনো সরকারি বা আদালতস্বীকৃত পরিচয় নয়; এটি স্থানীয়দের দেওয়া ব্যঙ্গাত্মক আখ্যা। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির সামনে এখন বড় কাজ।২৭৫ বস্তা কোথা থেকে এলো? কোথায় মজুত ছিল?
কত বস্তা বিতরণ হয়েছে? কারা পেয়েছে? কোন তালিকায় পেয়েছে? কত বস্তা অবশিষ্ট? ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে কত বস্তা বের হয়েছে?মাইক্রোবাসে কারা তুলেছে? কোথায় নেওয়া হয়েছে?
যিনি বা যারা নিয়েছেন, তাঁদের নাম রেজিস্টারে আছে কি না? সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তদন্তেই।
কারণ সরকারি ত্রাণের ক্ষেত্রে ‘বস্তা গুনে লাভ কী, হিসাব না মিললে?’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, যার দপ্তর, তার কাছে জিজ্ঞেস করেন। যদি অভিযোগ সত্য হয়, বিষয়টি জেলা কর্মকর্তা তাঁর বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।

জেলা কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, যেহেতু স্থানীয় প্রশাসন ইউএনও। তিনি বিষয়টি দেখবেন।
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি দেখতেছি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত নামে খ্যাত’ পিআইও তদন্ত ৩ চোরদের হাতে

আপডেট: ০৩:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

আতিকুর রহমান আতিক বিশেষ প্রতিনিধি:

গরিবের জন্য সরকারি ত্রাণ। বস্তায় চাল-ডাল-তেল-লবণ-চিনি সবই আছে। শুধু যেন নেই হিসাবের খাতা! অফিস ছুটির পর ত্রাণের বস্তা মাইক্রোবাসে উঠছে, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, আর ২৭৫ বস্তা শুকনো খাবারের হিসাব চাইলে সংশ্লিষ্টদের মুখে যেন তালা!

ঘটনার পর স্থানীয়দের ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মাইদুল ইসলামকে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত খ্যাত’ পিআইও বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। অবশ্য এটি স্থানীয়দের দেওয়া আখ্যা অভিযোগের সত্যতা ও দায়-দায়িত্ব তদন্তেই নির্ধারিত হবে। ঘটনা নিয়ে এবার প্রশাসনেরও টনক নড়েছে। পিআইওর বিরুদ্ধে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাহফুজার রহমান মাহফুজ। সদস্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন ও উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান।

গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সরকারি অফিস ছুটির পর উপজেলা অফিসার্স কল্যাণ ক্লাবের স্টোররুম থেকে মাইক্রোবাসে করে সরকারি শুকনো খাবারের বস্তা নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ব্যস! ভিডিও ছড়াতেই শুরু প্রশ্নের বন্যা। অফিস ছুটি হলে মানুষ বাড়ি ফেরে, আর সরকারি ত্রাণের বস্তা যায় মাইক্রোবাসে এ কেমন ‘অফিস টাইম’?

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, পিআইও মো. মাইদুল ইসলামের উদ্যোগে তাঁর আত্মীয়স্বজনকে ডেকে স্টোররুম থেকে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দকৃত শুকনো খাবারের বস্তা মাইক্রোবাসে করে সরিয়ে নেওয়া হয়।বস্তা গেল কোথায়? কার হাতে গেল? কার নির্দেশে গেল? কেন অফিস ছুটির পর গেল? কোন রেজিস্টারে গেল?আর শেষ পর্যন্ত গরিবের ঘরে গেল তো? জরুরি ত্রাণ সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ২৭৫ বস্তা শুকনো খাবার।

প্রতিটি বস্তায় ১০ কেজি চাল, ১ কেজি মসুর ডাল, ১ কেজি লবণ, ১ কেজি চিনি, ১ লিটার সয়াবিন তেল, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়ার গুঁড়া রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিটি বস্তার ওজন ১৪ দশমিক ৩৫ কেজি। অর্থাৎ গরিবের ঘরে যাওয়ার কথা ছিল খাবার। কিন্তু এখন প্রশ্ন খাবার গেছে কোথায়? পিআইও কার্যালয়ে ২৭৫ বস্তার বরাদ্দ ও বিতরণসংক্রান্ত নথি দেখতে চাওয়া হয়। চাওয়া হয় বিতরণের মাস্টাররোল ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা সেগুলো দেখাতে পারেননি। এ যেন এক অদ্ভুত হিসাব!বস্তা আছে,হিসাব নেই। বরাদ্দ আছে,নথি নেই। ত্রাণ আছে,গন্তব্যের পরিষ্কার তথ্য নেই।

স্থানীয়দের রসিক প্রশ্ন, ২৭৫ বস্তা ত্রাণ কি গরিবদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে, নাকি হিসাবের খাতায় বসেই সবাই ত্রাণ খেয়ে ফেলেছে? পিআইওর জবাব ‘আমি কিছু বলবো না!’ অভিযোগের বিষয়ে পিআইও মো. মাইদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তাঁর জবাব, আমি কিছু বলবো না। ইউএনওকে জিজ্ঞেস করেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ইউএনও কি সরকারি শুকনো খাবার কালোবাজারে বিক্রি করতে বলেছেন? এই প্রশ্নেও কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

ফলে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়,যদি সবকিছু নিয়মমাফিক হয়, তাহলে হিসাব দেখাতে আপত্তি কোথায়? আর যদি হিসাব থাকে, তাহলে হিসাব দেখাতে এত অনীহা কেন? অবশ্য এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে। ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত’ নামের পেছনে কী?

স্থানীয়দের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে পিআইওকে ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত খ্যাত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারি সম্পদ নিয়ে যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি দপ্তরের সমস্যা নয় ,এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রশ্ন। তবে ‘রাষ্ট্রীয় ডাকাত’ কোনো সরকারি বা আদালতস্বীকৃত পরিচয় নয়; এটি স্থানীয়দের দেওয়া ব্যঙ্গাত্মক আখ্যা। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির সামনে এখন বড় কাজ।২৭৫ বস্তা কোথা থেকে এলো? কোথায় মজুত ছিল?
কত বস্তা বিতরণ হয়েছে? কারা পেয়েছে? কোন তালিকায় পেয়েছে? কত বস্তা অবশিষ্ট? ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে কত বস্তা বের হয়েছে?মাইক্রোবাসে কারা তুলেছে? কোথায় নেওয়া হয়েছে?
যিনি বা যারা নিয়েছেন, তাঁদের নাম রেজিস্টারে আছে কি না? সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তদন্তেই।
কারণ সরকারি ত্রাণের ক্ষেত্রে ‘বস্তা গুনে লাভ কী, হিসাব না মিললে?’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, যার দপ্তর, তার কাছে জিজ্ঞেস করেন। যদি অভিযোগ সত্য হয়, বিষয়টি জেলা কর্মকর্তা তাঁর বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।

জেলা কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, যেহেতু স্থানীয় প্রশাসন ইউএনও। তিনি বিষয়টি দেখবেন।
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি দেখতেছি।